বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণে স্থবিরতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিও কমেছে অথবা সামান্য বেড়েছে। একই সময়ে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ায় নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাও কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিম বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এ সময়ে ঋণের স্থিতি প্রায় ১৭ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৮ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংকভিত্তিক হিসাব বলছে, এই ছয় মাসে অন্তত ১৪টি ব্যাংকের ঋণস্থিতি কমেছে অথবা প্রায় কোনো প্রবৃদ্ধিই হয়নি। অর্থাৎ সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে ঋণ কিছুটা বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি সব ব্যাংকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েনি।
সবচেয়ে বড় সংকোচন হয়েছে সোনালী ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওতে। ব্যাংকটির বকেয়া ঋণ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বা ৯ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা কমেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৯৫ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা থেকে জুনে সোনালী ব্যাংকের ঋণস্থিতি নেমে এসেছে ৮৫ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকায়।
যমুনা ব্যাংকের ঋণ কমেছে ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এনআরবিসি ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিও সংকুচিত হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। দেশের বড় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ঋণও ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমেছে। ব্যাংকটির ঋণস্থিতি ৪৪ হাজার ৮৮৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা থেকে কমে ৪৩ হাজার ৫৬৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া ইস্টার্ন ব্যাংকের ঋণ ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংকের ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকের শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ কমেছে। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ কমেছে ১ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং বেসিক ব্যাংকের ১ দশমিক ০২ শতাংশ।
একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যেও ঋণ বিতরণে তেমন গতি দেখা যায়নি। জনতা ব্যাংকের ঋণস্থিতি ৩ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং রূপালী ব্যাংকের ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়েছে।
কয়েকটি ব্যাংকের প্রবৃদ্ধিতেই সামগ্রিক ঋণ বেড়েছে
অন্যদিকে কিছু ব্যাংক তুলনামূলক বেশি হারে ঋণ বাড়িয়েছে। কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ ঋণ প্রবৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ ৫০ দশমিক ১২ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। তবে ব্যাংকটির ঋণ পোর্টফোলিও তুলনামূলক ছোট ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। ১ হাজার ৮৮ কোটি টাকা থেকে ঋণ বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা।
উত্তরা ব্যাংকের ঋণ বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং সিটিজেন্স ব্যাংক ৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করেছে।
পরিমাণের হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঋণ যোগ করেছে সিটি ব্যাংক। ব্যাংকটির ঋণস্থিতি ৪ হাজার ৮৬ কোটি টাকা বেড়ে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে যে সামান্য ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে সীমিতসংখ্যক ব্যাংকের সম্প্রসারণ থেকে।
ঋণের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে শ্রেণিকৃত ঋণ
ব্যাংক ঋণে স্থবিরতার পাশাপাশি সম্পদের মান নিয়েও চাপ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে শ্রেণিকৃত ঋণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ছয় মাসে বেড়েছে ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
ফলে জুনে মোট বকেয়া ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ শ্রেণিকৃত ঋণে পরিণত হয়েছে। ডিসেম্বরের হিসাবে এই হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
ঋণের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি যেখানে খুবই সীমিত, সেখানে সমস্যাগ্রস্ত ঋণ দ্রুত বাড়তে থাকায় ব্যাংকগুলোর ওপর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার চাপও বাড়ছে। বিদ্যমান ঋণ আদায়, ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই এবং নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি মূল্যায়ন এখন ব্যাংকগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বেসরকারি ঋণে সামান্য গতি
এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণ ১০ দশমিক ৯১ শতাংশ কমেছে।
অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ঋণপ্রবাহও ছিল অসম। বাণিজ্য খাতে ঋণ ৪ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু মেয়াদি ঋণ বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ। কার্যকরী মূলধনের অর্থায়ন শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ কমেছে। নির্মাণ খাতে ঋণ কমেছে ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ।
এতে বোঝা যায়, ব্যাংক ঋণের সম্প্রসারণ অর্থনীতির সব খাতে সমানভাবে ঘটছে না। কিছু ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ঋণ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং কার্যকরী মূলধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে প্রবৃদ্ধি দুর্বল রয়েছে।
সরকারি সিকিউরিটিজে বাড়ছে ব্যাংকের বিনিয়োগ
নতুন ঋণ বাড়ানোর পরিবর্তে ব্যাংকগুলো সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ট্রেজারি বিল ও বন্ডসহ এসব উপকরণে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ছয় মাসে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৬ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা থেকে জুনে সরকারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকের বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকায়। ঋণ প্রবৃদ্ধির তুলনায় এই বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর নেওয়া ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। ছয় মাসে এই ঋণ ২৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা থেকে ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সর্বশেষ প্রান্তিকের তথ্যেও ব্যাংকের বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। এপ্রিল-জুন সময়ে ব্যাংক বিনিয়োগ ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়েছে, যা একই সময়ে ঋণ বৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি।
সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে অর্থের প্রবাহ পুরোপুরি থেমে যায়নি; বরং অর্থ ব্যবহারের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। নতুন ঋণ বিতরণের বদলে ব্যাংকগুলো সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যমান ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
শ্রেণিকৃত ঋণ দ্রুত বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোর জন্য নতুন করে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণও সহজ হচ্ছে না। ফলে ব্যাংকিং খাতের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় ঋণপ্রবাহ সচল রাখা, অন্যদিকে বাড়তে থাকা সমস্যাগ্রস্ত ঋণের ঝুঁকি সামাল দেওয়া। জুন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য সেই চাপেরই একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে।









