কক্সবাজারের মহেশখালীতে চোর সন্দেহে মো. ফয়সাল (২৬) নামে এক যুবককে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দফায় দফায় মারধর ও ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার সকালে উপজেলার বড় মহেশখালী ইউনিয়নের পূর্ব ফকিরাঘোনা এলাকার মিয়াজির পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে।
মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুস সুলতান জানান, মিয়াজির পাড়ায় মাওলানা কেফায়েত উল্লাহর বাড়ি ও সংলগ্ন স্টিলের আসবাবপত্রের কারখানায় চুরির উদ্দেশ্যে প্রবেশের সন্দেহে ফয়সালকে আটক করা হয়েছিল। পরে তাকে মারধর করা হয়।
নিহত ফয়সাল একই এলাকার বাসিন্দা নুরুল আলমের ছেলে। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে ঘিরে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ভিডিওতে একদল কিশোরকে ফয়সালকে মারধর করতে দেখা যায়। বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় তার পিঠে ইট দিয়ে আঘাত করার দৃশ্যও ভিডিওতে রয়েছে।
ফয়সালের বাবা নুরুল আলম বলেন, মঙ্গলবার ফজরের পর ঘুম থেকে উঠে তিনি ছেলেকে মারধর করে হাসপাতালে নেওয়ার খবর পান। পরে হাসপাতালে গিয়ে ছেলের মরদেহ দেখতে পান।
তিনি বলেন, “মানুষ এসে বলছে, তোমার ছেলেকে মেরে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। হাসপাতালে গিয়ে দেখি ছেলে মৃত।”
নুরুল আলম জানান, ফয়সাল তার সঙ্গে সড়কের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। মঙ্গলবার ভোরেও কাজের জন্য লোকজন ডাকতে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন।
ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা চুরির অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নুরুল আলম। তার ভাষ্য, ফয়সাল চুরি করে থাকলে তার কাছে মোবাইল ফোন, টাকা বা স্বর্ণালংকারের মতো কোনো জিনিস পাওয়া যাওয়ার কথা। কিন্তু এমন কিছু পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।
হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মৃত্যু হয়েছে বলে পুলিশের ধারণা
মহেশখালী থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুস সুলতান বলেন, ফয়সালকে আটকের পর মারধর করে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ওই বাড়ির এক যুবককে আটক করা হয়েছে বলে জানান ওসি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
ওসি আরও বলেন, স্থানীয়ভাবে ফয়সালের চুরি করার অভ্যাস রয়েছে—এমন তথ্য পুলিশ পেয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে চুরির ঘটনায় কোনো মামলা বা পুলিশের নথিভুক্ত রেকর্ড আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন রেকর্ড নেই।
ফলে ফয়সাল আগে কোনো চুরির ঘটনায় জড়িত ছিলেন কি না, সে বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যেও নিশ্চিত কোনো মামলা বা নথির তথ্য পাওয়া যায়নি।
‘চুরি করলেও এভাবে মেরে ফেলা যায় না’
ঘটনার বিষয়ে বড় মহেশখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনায়েত উল্লাহ বাবুল বলেন, তিনি যতটুকু জানতে পেরেছেন, চোর সন্দেহে ফয়সালকে আটক করে মারধর করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “ছেলেটা ঘরে নাকি চুরি করতে গেছিল। চোর সন্দেহে ওকে ধরছে, ধরে অনেকটা মারধর করে মারা গেছে।”
তবে চুরির অভিযোগ সত্য হলেও কাউকে এভাবে পিটিয়ে হত্যা করা যায় না বলে স্পষ্টভাবে মন্তব্য করেন চেয়ারম্যান। তার ভাষায়, “মেরে ফেলা যায় না। চুরি করলেও এভাবে মেরে ফেলা যায় না।”
এ ঘটনায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। নিহতের বাবা নুরুল আলম জানান, ফয়সালের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং তারা সেটি নিয়ে বাড়িতে ফেরেন।
নুরুল আলম বলেন, মরদেহ দাফনের পর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ওসি আব্দুস সুলতান। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন এবং কীভাবে ফয়সালের মৃত্যু হয়েছে, তা আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।








