,

মেঘালয়ে বাঙালি জনবসতি, শিলংয়ের রূপান্তর ও অস্তিত্বের ঐতিহাসিক ইতিবৃত্ত

উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় মালভূমি এবং প্রাচ্য বঙ্গভূমির ভৌগোলিক ও সামাজিক সম্পর্ক কোনো আধুনিক ঔপনিবেশিক কৃত্রিম সীমানার ফসল নয়; বরং তা সুপ্রাচীন কাল থেকে পর্বত ও সমতলের মধ্যে প্রবাহিত এক নিরবচ্ছিন্ন সভ্যতার ইতিহাস। দক্ষিণে সুরমা-বরাক উপত্যকা (সিলেট) এবং ময়মনসিংহের বিস্তীর্ণ পলিমাটির সমতল, আর উত্তরে খাসিয়া, জয়ন্তিয়া ও গারো পাহাড়ের পাইনঘেরা শৃঙ্গ—এই দুই ভূখণ্ডের সহাবস্থান যুগ যুগ ধরে বাণিজ্য, জনমিতিক আদান-প্রদান ও সংস্কৃতির লেনদেনকে সহজতর করেছে। ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, পূর্ব ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে শিলংয়ের উত্থান, রবীন্দ্র-সাহিত্যের নন্দনতাত্ত্বিক প্রেরণা এবং স্বাধীনোত্তর ভারতের জাতিগত রাজনীতির জটিল প্রেক্ষাপট—সবকিছু মিলিয়ে মেঘালয়ের বুকে বাঙালি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস যেমন গৌরবোজ্জ্বল, তেমনই এক অস্তিত্বমুখী সংগ্রামের মহাকাব্য।

প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগে মেঘালয়ের খাসিয়া, জয়ন্তিয়া ও গারো রাজন্যবর্গ এবং উপজাতীয় প্রধানদের (খাসি সিইম ও গারো নকমা) সাথে সংলগ্ন সিলেটের ভাটপাড়া, লাউড় রাজ্য এবং ময়মনসিংহের সুসং ও শেরপুরের বঙ্গীয় জমিদারদের গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক ছিল। জয়ন্তিয়া পাহাড়ের রাজারা সিলেটের সমতল জয় করে জয়ন্তিয়া পরগণায় রাজত্ব পরিচালনা করতেন, যেখানে সংস্কৃত ও বাংলা ভাষার ব্যাপক চর্চা ছিল। পাহাড় থেকে খাসিয়া তেজপাতা, কমলালেবু, বাঁশ ও কাঁচা সুপারি সমতলে নেমে আসত; আর বঙ্গভূমি থেকে চাল, শুঁটকি, লবণ ও সুতি বস্ত্র পাহাড়ে যেত। এই বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের প্রধান সীমান্তকেন্দ্রগুলো (যেমন ছাতক, ভোলাগঞ্জ, কোম্পানিগঞ্জ ও ময়মনসিংহের সীমান্তে) ঘিরে উভয় সম্প্রদায়ের প্রাত্যহিক জীবনের নিবিড় সংমিশ্রণ ঘটেছিল, যা মেঘালয়ের উপত্যকাগুলোতে বঙ্গীয় সংস্কৃতির প্রাথমিক প্রাক-ভিত্তি রচনা করে।

মেঘালয়ে বাঙালি জনবসতির স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার সবচেয়ে বড় বেগ পায় ১৮৭৪ সালে, যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পর রাজপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার আসামকে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে পৃথক করে ‘চিফ কমিশনার্স প্রভিন্স অব আসাম’ গঠন করে। এই নতুন গঠিত আসাম প্রদেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র বা রাজধানী হিসেবে বেছে নেওয়া হয় পাহাড়ঘেরা অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত শহর শিলংকে। ব্রিটিশ প্রশাসনের সুবিধার্থে, রাজ্য চালনার জন্য প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বিচারক, রাজস্ব আদায়কারী, ক্লার্ক, চিকিৎসক, আইনজীবী ও প্রকৌশলী প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তৎকালীন আসামে আধুনিক শিক্ষিত জনবলের অভাব থাকায় সিলেট, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও কলকাতা থেকে হাজার হাজার বাঙালি পেশাজীবী পরিবার শিলংয়ে এসে স্থায়ী আবাসন গড়ে তোলেন। এভাবে মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে শিলং কেবল আসামের প্রশাসনিক রাজধানী নয়, বরং উত্তর-পূর্ব ভারতের বঙ্গীয় ‘ভদ্রলোক’ সমাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক ও নাগরিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

শিলং কেবল প্রশাসনিক ফাইলপত্রের শহর ছিল না; তা রূপ নিয়েছিল এক অনন্য নন্দনতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক সুতিকাগারে। এর প্রধান প্রাণপুরুষ ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯১৯, ১৯২৩ এবং ১৯২৭—তিনটি পৃথক পর্বে রবীন্দ্রনাথ শিলং ভ্রমণ করেন এবং সেখানে অবস্থানকালে তাঁর সাহিত্যের কিছু কালজয়ী রত্ন সৃষ্টি করেন। শিলংয়ের ‘ব্রুকসাইড’ ও ‘জিতভূমি’র পাহাড়ি পরিবেশে বসেই রচিত হয়েছিল নাটক ‘রক্তকরবী’, কাব্যগ্রন্থ ‘পূরবী’ এবং রবীন্দ্রনাথের সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় রোমান্টিক উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’। ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের মূল পটভূমি ছিল শিলংয়ের পাহাড়ি পথ, পাইনবনের রৌদ্রছায়া ও ইউরোপীয় শৈলীর কটেজগুলো, যা তৎকালীন বাঙালি মননে শিলংকে এক মায়াবী স্বপ্নপুরী হিসেবে অমর করে তোলে।

অংশ হিসেবে শিক্ষা প্রসারেও বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ছিল অনন্য। সেন্ট এডমন্ডস, সেন্ট সেইন্ট অ্যান্থনিস, লেডি কীন কলেজ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় এবং স্থানীয় খাসি ও জয়ন্তিয়া ভাষার লিখিত রূপ (রোমান লিপিতে) ও সাহিত্য গঠনে প্রখ্যাত বাঙালি শিক্ষাবিদ ও খ্রিষ্টান মিশনারিদের প্রত্যক্ষ অবদান ছিল। একই সাথে ১৯৩০-এর দশকে শিলংয়ে প্রতিষ্ঠিত ‘আসাম বাঙালি সাহিত্য পরিষদ’ এবং প্রেস ক্লাব উত্তর-পূর্ব ভারতে বাংলা সাহিত্যচর্চার প্রধান দুর্গে পরিণত হয়।

পাহাড়ের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র শিলংয়ের পাশাপাশি মেঘালয়ের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত গারো পাহাড়ের (West Garo Hills) ইতিহাস ছিল কিছুটা ভিন্ন। ময়মনসিংহ ও শেরপুর সীমান্ত সংলগ্ন ফুলবাড়ী, রাজাবালা, মহেন্দ্রগঞ্জ ও তুরা (Tura)-র সমতল ও নদী অববাহিকাগুলোতে প্রাক-ঔপনিবেশিক কাল থেকেই কৃষিভিত্তিক বাঙালি (হিন্দু ও মুসলিম উভয়) সমাজ বসবাস করে আসছিল। ব্রহ্মপুত্র ও জিনজিরাম নদীর পলিধোয়া এই ভূখণ্ডে কৃষি উৎপাদন, মৎস্যচাষ এবং স্থানীয় হাটে বাণিজ্য পরিচালনায় বাঙালি কৃষকরা এক অপরিহার্য অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।

১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ মেঘালয়ের বাঙালি জনমিতিতে এক অভূতপূর্ব ধাক্কা দেয়। দেশভাগের ফলে সিলেটের এক বিশাল অংশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলেও, ভৌগোলিক সীমানার কারণে বহু বাস্তুচ্যুত হিন্দু শরণার্থী শিলং, জাফলং সীমান্ত এবং গারো পাহাড়ের সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মেঘালয় সীমান্ত হয়ে ওঠে লাখ লাখ বাঙালি শরণার্থীর প্রধান আশ্রয়স্থল এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবিরের কেন্দ্রবিন্দু (যেমন ইকো সংকেত কেন্দ্র ও তুরা ট্রানজিট ক্যাম্প)। যুদ্ধ শেষে একটি বিরাট অংশ বাংলাদেশে ফিরে গেলেও, পূর্ববর্তী দশকের বাস্তুচ্যুত বহু পরিবার মেঘালয়ের নাগরিক হিসেবে স্থায়ীভাবে থেকে যান।

১৯৭২ সালে আসাম ভেঙে পৃথক ‘মেঘালয়’ রাজ্য গঠিত হওয়ার পর মেঘালয়ের জাতিগত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক কঠিন মোড়ে দাঁড়ায়। স্বাধীনোত্তর রাজ্যটিতে ভূমিসন্তান (Indigenous Tribal People—Khasi, Garo, Jaintia) এবং তথাকথিত বহিরাগত সংখ্যালঘু (Non-Tribal—Bengali, Nepali, Assamese) সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়। ১৯৭৯, ১৯৮৭ এবং ১৯৯২ সালে শিলং ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ঘটা একাধিক জাতিগত সংঘাত ও অস্থিরতা বাঙালি সমাজকে চরম সামাজিক ও নিরাপত্তার সংকটে ফেলে দেয়। বহু ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পরিবার শিলং ত্যাগ করতে বাধ্য হন, যা শহরটির ঐতিহাসিক বহুমাত্রিক নাগরিক চরিত্রকে কিছুটা সংকুচিত করে। পরবর্তীতে ‘ইনার লাইন পারমিট’ (ILP) চালুর দাবি এবং নাগরিকত্ব আইন (CAA/NRC) সংক্রান্ত প্রশাসনিক তর্কে মেঘালয়ের বাঙালি সমাজকে প্রতিনিয়ত নিজেদের আত্মপরিচয় ও আইনি স্থায়িত্বের পরীক্ষা দিতে হয়েছে।

আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে মেঘালয়ের বাঙালি সমাজ তাঁদের সুদীর্ঘ দেড়শত বছরের স্মৃতি, ঐতিহ্য ও নাগরিক অবদানকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন। শিলংয়ের লবান (Laban), জাওয়াই, Keating Road কিংবা গারো পাহাড়ের রাজাবালা ও তুরায় আজ শতবর্ষী দুর্গাপূজা, রবীন্দ্রজয়ন্তী এবং কালীপূজা সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়। এখানকার নতুন প্রজন্মের বাঙালিরা সাবলীলভাবে খাসি ও গারো ভাষা আয়ত্ত করে স্থানীয় উপজাতীয় সমাজের সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক নতুন সামাজিক সেতু গড়ে তুলছেন।

মেঘালয়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, এখানকার বাঙালিরা কেবল সীমান্ত পেরিয়ে আসা কোনো সাময়িক পরিযায়ী গোষ্ঠী নন; বরং তারা শিলংয়ের নগর রূপায়ন, শিক্ষা-সাহিত্যের বিকাশ, পর্বত ও সমতলের প্রশাসনিক সংহতকরণ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বহুসাংস্কৃতিক ইতিহাসের পলিস্তরে মিশে থাকা এক চিরন্তন ঐতিহাসিক সত্য।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।