রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার পরও দীর্ঘ সময় ঘটনাস্থলেই অবস্থান করেছিলেন দুই অভিযুক্ত। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের পর তাঁরা ওই বাড়ির বাথরুমে গোসল করেন, ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও শসা খান এবং সেখানেই মাদক সেবন করেন। পরে জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট তুলনামূলক ফাঁকা থাকার সুযোগ নিয়ে বাড়ি থেকে কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বেরিয়ে যান। ঘটনাটির তদন্তে উঠে আসা এসব তথ্য এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
রোববার ২৩ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এসব তথ্য জানান। এ ঘটনায় শ্রীমুগ্ধ ওরফে মুগ্ধ, ২৩, এবং সিদ্ধার্থ দাস, ১৯, নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোববার ভোরে মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকেই তাঁদের আটক করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, দুজনের বাড়িও একই এলাকায় এবং তাঁরা পরস্পরের মামাতো ভাই।
শনিবার রাত ১১টার দিকে মাছুয়াপাড়ার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, ৬৫, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ওরফে ভোলা, ৫০, মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী, ২৫, এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী।
Table of Contents
ছাদ থেকে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। অভিযুক্ত দুই যুবক পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে নিয়মিত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যাতায়াত করতেন। ঘটনার রাতে তাঁরা ছাদে বসে মাদক সেবন করছিলেন। শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে গেলে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তখন তাঁর গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
স্বামীর বাঁচার চেষ্টার শব্দ শুনে প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়িতে তাঁকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে মায়ের চিৎকার শুনে মেয়ে প্রার্থী এগিয়ে এলে তিনিও হামলার শিকার হন। পুলিশের দাবি, তাঁকে হত্যা করতে কয়েক মিনিট সময় লাগে। একপর্যায়ে রশি দিয়ে তাঁর গলা ও মুখ শক্তভাবে পেঁচিয়ে টানা হয়।
এরপর নিচতলায় ঘুমিয়ে থাকা শিশু প্রিয়মকেও হত্যা করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তার গলায় কাপড় পেঁচানোর পর বালিশ চাপা দেওয়া হয়েছিল। তদন্তকারীদের কাছে অভিযুক্তরা জানিয়েছে, প্রিয়ম তাঁদের চিনত। সিদ্ধার্থের ছোট ভাই অপূর্বর সঙ্গে প্রিয়মের বন্ধুত্ব ছিল এবং তারা একসঙ্গে খেলাধুলা করত। পরিচিত হওয়ার কারণে শিশুটিকেও বাঁচিয়ে রাখা হয়নি বলে পুলিশ দাবি করেছে।
হত্যার পর গোসল, খাবার ও মাদক সেবন
চারজনকে হত্যার পর অভিযুক্তরা দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাননি। বরং তাঁরা আরও কিছু সময় সেখানে অবস্থান করেন। পুলিশ জানিয়েছে, সকালে প্রথমে সিদ্ধার্থ এবং পরে মুগ্ধ বাড়ির বাথরুমে গোসল করেন। এরপর তাঁরা ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও শসা খান। একই স্থানে মাদক সেবনের ঘটনাও ঘটেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা কিছু আলামত পুলিশের এই দাবিকে সমর্থন করছে বলে জানানো হয়েছে। সেখানে খেজুরের বিচি এবং অর্ধেক খাওয়া একটি শসা পাওয়া যায়। খেজুরের বিচি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। মাদক সেবনের সঙ্গে সম্পর্কিত আলামতও সংগ্রহ করা হয়েছে বলে তদন্তকারী দল জানিয়েছে।
ডাকাতির ছক সাজানোর চেষ্টা
পুলিশের ধারণা, হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল। বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করে রাখা হয়। দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে একটি বালতির মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল। পুলিশের ধারণা, ফোনে থাকা সম্ভাব্য আঙুলের ছাপ বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে।
শুক্রবার জুমার নামাজের সময় তাঁরা বাড়ি থেকে বের হন। ওই সময়ে অনেক মানুষ মসজিদে থাকায় রাস্তাঘাট তুলনামূলক ফাঁকা থাকার সুযোগ নেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। বের হওয়ার সময় তাঁরা বাড়ি থেকে কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে যান। পরে এসব অলংকার একটি মন্দিরের পেছনের পরিত্যক্ত জায়গায় রেখে দেওয়া হয়। অভিযুক্তদের দেখানো স্থান থেকে সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্বর্ণের কাজে সিদ্ধার্থের অভিজ্ঞতা
তদন্তে সিদ্ধার্থের পেশাগত পরিচয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, সে প্রায় আট বছর ধরে একটি স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করছিল। ফলে স্বর্ণ ও নকল অলংকার শনাক্ত করার বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
ঘটনাস্থলে একটি চুরি আগুনে পুড়িয়ে পরীক্ষা করার আলামত পাওয়ার পর তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও জোরালো হয়। তাঁদের ধারণা, স্বর্ণের কাজ সম্পর্কে অভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা থাকলে এমন পরীক্ষা করার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই নেওয়া হবে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের আগে দুই অভিযুক্ত অন্য একটি বাসায় বসেও মাদক সেবন করেছিল। পরে তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যায়। মুগ্ধ মাছের দোকানে কাজ করত বলেও পুলিশ জানিয়েছে। তদন্তে মাদক সংগ্রহের সঙ্গে স্থানীয় একটি যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে।
পরিচিত মানুষই হয়ে উঠলেন সন্দেহভাজন
নিহত পরিবারের সঙ্গে দুই অভিযুক্তের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। তাঁরা গণপতি চক্রবর্তীকে ‘স্যার’ এবং তাঁর স্ত্রীকে ‘কাকি’ বলে ডাকতেন। পাশের ভবনের ওপর দিয়ে নিয়মিত ওই বাড়ির ছাদে যাতায়াতের কারণে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। ছোট শিশু প্রিয়মও তাঁদের চিনত।
তদন্তকারীদের কাছে এই পরিচিতির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে বাইরের কোনো অচেনা ব্যক্তির চেয়ে পরিচিত ব্যক্তির উপস্থিতি বা চলাচল সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ কম থাকার সম্ভাবনা থাকে। তবে হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য, পরিকল্পনার পরিধি এবং প্রত্যেক অভিযুক্তের ভূমিকা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
ফরেনসিক পরীক্ষায় মিলবে আরও তথ্য
ঘটনাটি প্রথমে হত্যা নাকি ডাকাতির উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছে, তা নিয়ে তদন্তকারীদের মধ্যে প্রশ্ন ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। সে কারণে ঘটনাস্থলের আলামত, অভিযুক্তদের গতিবিধি, জিজ্ঞাসাবাদ, উদ্ধার করা সামগ্রী এবং গোয়েন্দা তথ্য—সবকিছু মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
রংপুর মহানগর পুলিশ, গোয়েন্দা শাখা, অপরাধ তদন্ত বিভাগসহ বিভিন্ন ইউনিট তদন্তে যুক্ত রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামতের বৈজ্ঞানিক ও ফরেনসিক বিশ্লেষণও চলছে। খেজুরের বিচি, অন্যান্য বস্তু এবং সম্ভাব্য জৈবিক আলামত পরীক্ষার ফল তদন্তের গতিপথ আরও স্পষ্ট করতে পারে।
এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ করে দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়ার চেষ্টা করা হবে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হবে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি এবং তদন্তেও এ ধরনের কোনো তথ্য মেলেনি।
একই পরিবারের চারজনকে একের পর এক হত্যার ঘটনায় মাছুয়াপাড়া এলাকায় শোক ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হত্যার পরও অভিযুক্তদের দীর্ঘ সময় বাড়িতে থাকা, গোসল করা, খাবার খাওয়া, মাদক সেবন এবং পরে স্বর্ণালংকার নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার তথ্য ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো—হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী ছিল, পুরো ঘটনায় আর কেউ জড়িত ছিল কি না এবং উদ্ধার হওয়া আলামতগুলো অভিযুক্তদের বক্তব্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার পর।









