দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৮৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। রোববার, ২৩ আগস্ট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে চারজন ঢাকা বিভাগের এবং একজন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা। নতুন পাঁচ মৃত্যুর ফলে চলতি বছরের শুরু থেকে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ জনে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা পৌঁছেছে ২৮ হাজার ৯২৯ জনে।
নতুন করে ৮৩৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১ হাজার ৯৫১ জন। চলতি বছর এ পর্যন্ত চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২৬ হাজার ৮৯৬ জন। অর্থাৎ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বড় একটি অংশ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে নতুন রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তির ধারাবাহিকতা পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
কয়েক দিনের ব্যবধানে বেড়েছে আক্রান্ত ও মৃত্যু
চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক সময়ের ঊর্ধ্বগতি বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১২ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২২ হাজার ২৪৩ এবং মৃতের সংখ্যা ছিল ৬৫। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই আক্রান্তের মোট সংখ্যা ২৮ হাজার ৯২৯ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৮২-তে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ ১২ আগস্টের পর থেকে হাসপাতালভিত্তিক মোট আক্রান্তের হিসাবে ৬ হাজার ৬৮৬ জন এবং মৃত্যুর হিসাবে ১৭ জন যোগ হয়েছে। এতে বোঝা যায়, আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে ডেঙ্গুর সংক্রমণ পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে।
বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ার অন্যতম কারণ এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হওয়া। বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের অংশ, ছাদ, ড্রেন, পরিত্যক্ত টায়ার কিংবা অন্যান্য স্থানে জমে থাকলে সেখানে মশার বংশবিস্তার হতে পারে। নগর ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন ছোট ছোট প্রজননস্থল ছড়িয়ে থাকায় নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
আগের দুই বছরের তুলনায় পরিস্থিতি
গত দুই বছরের পরিসংখ্যানও ডেঙ্গুর ভয়াবহতার মাত্রা বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ৪১৩ জন। এর আগের বছর, ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের।
| বছর/সময় | মোট আক্রান্ত | মোট মৃত্যু |
|---|---|---|
| ২০২৪ | ১,০১,২১৪ | ৫৭৫ |
| ২০২৫ | ১,০২,৮৬১ | ৪১৩ |
| ২০২৬, ১২ আগস্ট পর্যন্ত | ২২,২৪৩ | ৬৫ |
| ২০২৬, ২৩ আগস্ট পর্যন্ত | ২৮,৯২৯ | ৮২ |
| ১২ আগস্টের পর আক্রান্ত বৃদ্ধি | ৬,৬৮৬ | — |
| ১২ আগস্টের পর মৃত্যু বৃদ্ধি | — | ১৭ |
| ২০২৬, ২৩ আগস্ট পর্যন্ত চিকিৎসাধীন | ১,৯৫১ | — |
| ২০২৬, ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র | ২৬,৮৯৬ | — |
| সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি | ৮৩৯ | — |
| সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু | — | ৫ |
চলতি বছরের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো সামনে আসেনি। তাই আগের বছরের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করে পুরো বছরের ঝুঁকি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে আগস্টেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় আগামী সময় নিয়ে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রতিরোধে বাড়াতে হবে স্থানীয় উদ্যোগ
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির ভেতর ও আশপাশে কোথাও পানি জমে আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ফুলের টব, পানির পাত্র, ছাদের কোণ, নির্মাণসামগ্রীর পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার ও বিভিন্ন ধরনের খোলা পাত্রে জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। একই সঙ্গে ড্রেন ও অন্যান্য স্থানে পানি জমে থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে তা পরিষ্কারের ব্যবস্থা করা জরুরি।
জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, শরীর ও পেশিতে ব্যথা, দুর্বলতা, বমি কিংবা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় রোগীর পানিশূন্যতা ও রক্তক্ষরণের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই অসুস্থ ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছেছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় না এলেও সংক্রমণ বৃদ্ধির ধারাটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ব্যক্তি পর্যায়ে সতর্কতা, পরিবারভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা, স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার প্রস্তুতি—সবগুলো একসঙ্গে কার্যকর করা গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বর্ষা মৌসুম যত এগোবে, ততই জমে থাকা পানির উৎস ও এডিস মশার প্রজননস্থল দ্রুত শনাক্ত ও ধ্বংস করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়লে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি। আগামী কয়েক সপ্তাহে নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কোন দিকে যায়, সেটিই চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির পরবর্তী চিত্র নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।









