বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন কিছু বীর সেনানী রয়েছেন, যাঁদের জীবনকাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা কোনো দানে মেলে না; বরং এর পেছনে থাকে ইস্পাতকঠিন মনোবল, অসামান্য সাহস এবং নিজের জীবনকে বাজি রাখার মতো পরম দেশপ্রেম। এই অবিসংবাদিত মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রভাগে উচ্চারিত হয় কর্নেল শাফায়াত জামিল, বীর বিক্রমের নাম। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সম্মুখ সমরে তাঁর অসাধারণ নেতৃত্ব এবং সাহসিকতা তাঁকে ইতিহাসের এক অনন্য আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
১৯৪০ সালের পহেলা মার্চ জন্মগ্রহণ করা শাফায়াত জামিল সামরিক জীবন শুরু করেন ১৯৬৪ সালে, যখন তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। কর্মজীবনের একদম সূরচনালগ্ন থেকেই তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত দক্ষ, সুশৃঙ্খল ও পেশাদার সামরিক কর্মকর্তা। ১৯৭১ সালে তিনি ৪ঠা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন, যার মূল ঘাঁটি ছিল তৎকালীন কুমিল্লা সেনানিমাসে। একাত্তরের উত্তাল মার্চ মাসে সম্ভাব্য ভারতীয় আক্রমণের কথা বলে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ এই রেজিমেন্টের দুটি কোম্পানিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মোতায়েন করে। এর মধ্যে একটি কোম্পানির কমান্ডিং দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন মেজর শাফায়াত জামিল।
তবে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের গতিপ্রকৃতি তখন অন্য কোনো মোড়ের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বরোচিত গণহত্যা চালায়, তখন বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে এটি কোনো সাধারণ সামরিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ছিল আপামর বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ২৬ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার খবর পেয়েই তিনি তাঁর অধীনস্থ বাঙালি জওয়ানদের নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
কর্নেল শাফায়াত জামিল, বীর বিক্রমের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক
| সারণী সূচক | ঐতিহাসিক তথ্য ও বিবরণ |
| পূর্ণ নাম | কর্নেল শাফায়াত জামিল, বীর বিক্রম |
| জন্মতারিখ | ১ মার্চ ১৯৪০ |
| প্রয়াণ তারিখ | ১১ আগস্ট ২০১২ |
| কমিশন লাভ | ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে (ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট) |
| একাত্তরে পদবি | মেজর, ৪ঠা ও ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট |
| অংশগ্রহণকৃত অঞ্চল | কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, গঙ্গাসাগর, দেওয়ানগঞ্জ, ছাতক ও ছোটখেল |
| প্রধান সামরিক অভিযান | ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে ঐতিহাসিক ছোটখেল সম্মুখ সমর |
| রাষ্ট্রীয় খেতাব | বীর বিক্রম (স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য) |
| পরবর্তী সামরিক দায়িত্ব | কমান্ডার, ৪৬ পদাতিক ব্রিগেড (কর্নেল পদে উন্নীত) |
| সেনাবাহিনী থেকে অবসর | ২৬ মার্চ ১৯৮০ |
প্রতিরোধযুদ্ধের প্রথম ধাপে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আশুগঞ্জ, আখাউড়া এবং গঙ্গাসাগরসহ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকায় শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে তিনি ভারতের ত্রিপুরার মতিনগরে গিয়ে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়কের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাঁর সুচারু ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট দেওয়ানগঞ্জ ও ছাতকসহ বিভিন্ন রণাঙ্গনে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ লড়াই পরিচালনা করে। তিনি এমন একজন অনন্য কমান্ডার ছিলেন, যিনি শুধু নিরাপদ দূরত্ব থেকে মানচিত্র দেখে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন না; বরং যেকোনো জটিল পরিস্থিতিতে নিজে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সহযোদ্ধাদের মনোবল চাঙ্গা রাখতেন।
তাঁর সামরিক জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয় ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে সিলেটের রাধানগর ও ছোটখেল এলাকায়। এর আগে মিত্রবাহিনীর গোর্খা সৈন্যরা সেখানে আক্রমণ চালালেও প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছোটখেল মুক্ত করার কঠিন দায়িত্ব অর্পিত হয় মেজর শাফায়াত জামিলের ওপর। নিয়ম অনুযায়ী একজন ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়ার কথা না থাকলেও তিনি প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নিজে যোদ্ধাদের একেবারে অগ্রভাগে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
২৭ নভেম্বর গভীর রাতে প্রায় দেড়শ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ধানক্ষেত ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ঘিলাঘাঁটির দিকে অগ্রসর হন। অন্ধকারের আবরণে শত্রুর বাংকারগুলোর একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে মুক্তিযোদ্ধারা আকস্মিক আক্রমণ শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে শুরু হয় তুমুল গুলিবিনিময় এবং কয়েকটি স্থানে হাতাহাতি যুদ্ধ। মাত্র কুড়ি মিনিটের সেই ঝোড়ো আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী দিশেহারা হয়ে পিছু হটে এবং ছোটখেল এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
তবে বিজয়ের সেই মহোৎসবেও নেমে আসে এক চরম পরীক্ষা। ভোরের আলো ফোটার প্রাক্কালে যখন বিজিত অবস্থানগুলো গুছিয়ে নেওয়া হচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে শত্রুর একটি আকস্মিক গুলি এসে সরাসরি বিদ্ধ করে তাঁর ডান কোমর। রণাঙ্গনে লুটিয়ে পড়েন এই অকুতোভয় বীর। গুরুতর আহত অবস্থায় সহযোদ্ধারা দ্রুত তাঁকে ফিল্ড হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন। নিজের রক্ত দিয়ে সহযোদ্ধাদের নেতৃত্ব দিয়ে আনা বিজয়ের মূল্য পরিশোধ করেছিলেন তিনি।
স্বাধীনতার পর তাঁর এই অনন্য বীরত্ব ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করে। স্বাধীন দেশের মাটিতেও তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে পদোন্নতি পেয়ে কর্নেল হিসেবে ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তিনি নানা ঝামেলার মুখোমুখি হন এবং দীর্ঘ সামরিক জীবনের ইতি টেনে ১৯৮০ সালের ২৬ মার্চ অবসর গ্রহণ করেন।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে ২০১২ সালের ১১ আগস্ট তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তাঁর এই প্রয়াণ দিবসে পিছনের পানে তাকালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দেশপ্রেম কেবল ফাঁকা বুলি বা আবেগের প্রকাশ নয়; বরং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিজের জীবনকে নিঃশর্তভাবে সঁপে দেওয়ার চিরন্তন অঙ্গীকার। বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামে কর্নেল শাফায়াত জামিল এক চিরকালীন প্রেরণার উৎস হয়ে বেঁচে থাকবেন।
মন্তব্য