খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই আগস্ট ২০২৬, ৩:৪৯ পিএম

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অভিনব কৌশলে এক নবজাতক চুরির চেষ্টার ঘটনায় স্বামী-স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। পেটে ও কোমরে কাপড় পেঁচিয়ে নিজেকে প্রসূতি হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন ওই নারী। পরে শিশুটির পরিবারের সদস্যের কাছ থেকে নবজাতককে কোলে নেওয়ার সুযোগ নিয়ে স্বামীর সহায়তায় হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তবে শিশুটির দাদি বিষয়টি বুঝতে পেরে চিৎকার শুরু করলে স্থানীয় লোকজন ও হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত তৎপর হয়ে শিশুসহ ওই দম্পতিকে আটক করেন।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আটক ব্যক্তিরা হলেন উপজেলার ফাঁসিতলা গ্রামের মৃত ভোলা মিয়ার ছেলে সিরাজুল ইসলাম ও তার স্ত্রী শিফালী বেগম। পরে স্থানীয় লোকজন তাদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।
স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার তালুককানুপুর ইউনিয়নের সমসপাড়া গ্রামের জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী রুপালী বেগম সন্তান প্রসবের জন্য সোমবার সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। সন্তান জন্মের পর প্রসূতি মা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় নবজাতকের দেখাশোনার দায়িত্ব নেন তার দাদি জয়গুন বেওয়া।
হাসপাতালে অবস্থানের একপর্যায়ে পাশের একটি বেডে থাকা শিফালী বেগম নিজেকে প্রসূতি হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি নবজাতকটিকে কোলে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে জয়গুন বেওয়া বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ করেননি। তিনি শিশুটিকে শিফালীর হাতে তুলে দেন। কিছুক্ষণ শিশুটিকে কোলে রাখার পর সুযোগ বুঝে শিফালী তার স্বামী সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে নিচে নেমে যান।
তারা শিশুটিকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে অভিযোগ। এদিকে কিছুক্ষণ পর নাতিকে দেখতে না পেয়ে বিষয়টি বুঝতে পারেন জয়গুন বেওয়া। তিনি চিৎকার করে আশপাশের লোকজনকে জানালে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী ও স্থানীয়রা দ্রুত নিচে নেমে যান। এরপর শিশুসহ ওই দম্পতিকে ধাওয়া করা হয়। একপর্যায়ে তাদের আটক করা সম্ভব হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের ভাষ্য, ধাওয়ার সময় ওই দম্পতির সঙ্গে থাকা আরও কয়েকজন ব্যক্তি সেখান থেকে পালিয়ে যান। ফলে ঘটনাটির সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। পুলিশও বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে।
আটকের পর পুলিশ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শিফালী কীভাবে নিজেকে প্রসূতি হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, সে বিষয়ে তথ্য পায়। অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে অন্তঃসত্ত্বা বা সদ্য সন্তান প্রসব করা নারীর মতো দেখানোর জন্য পেট ও কোমরের চারপাশে কাপড় পেঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। এতে দূর থেকে তাকে স্বাভাবিক প্রসূতি বলে মনে হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এই কৌশল ব্যবহার করেই তিনি শিশুটির পরিবারের আস্থা অর্জন করেন বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর নবজাতককে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হওয়ায় পরিবারে স্বস্তি ফিরে আসে। তবে হাসপাতালের ভেতর থেকে একটি সদ্যোজাত শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার এই ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে প্রসূতি ও নবজাতকের ওয়ার্ডে বহিরাগতদের প্রবেশ, রোগী ও স্বজনদের পরিচয় যাচাই এবং নবজাতকের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সতর্কতার বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সদ্যোজাত শিশুরা সাধারণত সম্পূর্ণভাবে পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল থাকে। ফলে হাসপাতালের মতো জায়গায় অপরিচিত ব্যক্তির কাছে শিশুকে দেওয়ার আগে পরিচয় নিশ্চিত করা এবং পরিবারের একাধিক সদস্যের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরও রোগী ও নবজাতকদের নিরাপত্তায় কার্যকর নজরদারি রাখা প্রয়োজন।
ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে নবজাতকের মায়ের চাচাতো ভাই আব্দুর রাজ্জাক বাদী হয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় নবজাতক চুরির চেষ্টা এবং এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্বপন কুমার জানান, আব্দুর রাজ্জাক বাদী হয়ে মামলা করেছেন। আটক স্বামী-স্ত্রীকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হবে বলেও জানান তিনি।
পুলিশের তদন্তে এখন মূলত কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—আটক দম্পতির সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সম্পর্ক কী, তারা কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের সঙ্গে যুক্ত কি না এবং নবজাতকটিকে নিয়ে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল। এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত শেষ হলেই স্পষ্ট হবে। এদিকে উদ্ধার হওয়া নবজাতক বর্তমানে পরিবারের কাছেই রয়েছে।
মন্তব্য