বাংলাদেশে শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারে যাঁরা সততা এবং নিষ্ঠার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাঁদের শীর্ষে অবস্থান করছেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। কেবল একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না; বরং দেশীয় প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ তৈরি করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন করাই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় লক্ষ্য।
১৯২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ জেলার আড়ুয়াকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। বাবা ইয়াকুব হোসাইন চৌধুরী পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক। বাবার চাকরির কারণে ছোটবেলায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে তাঁকে। ময়মনসিংহ ও কলকাতার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর তিনি ফিরে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। কর্মজীবন শুরু করার জন্য বেছে নেন পাবনার আতাইকুলা নামক এক জনপদকে।
চিকিৎসক বাবার সান্নিধ্যে বড় হওয়ার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই ওষুধ ও মানুষের রোগব্যাধি সম্পর্কে সাধারণ ধারণার সাথে পরিচিত ছিলেন তিনি। ১৯৫২ সালে বাবার কাছ থেকে কিছু অর্থ নিয়ে আতাইকুলায় নিজের একটি ছোট ফার্মেসি প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানেই কাজ করার সময় তাঁর মনে ভাবনা আসে—অন্যের তৈরি ওষুধের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেদেরই ওষুধ উৎপাদনে নামা উচিত।
এই চিন্তা বাস্তবায়ন করতেই ১৯৫৮ সালে তিন বন্ধু—ডা. কাজী হারুন-উর-রশীদ, ডা. পি. কে. সাহা এবং রাধাবিনোদ রায়কে সঙ্গে নিয়ে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ‘স্কয়ার’ (Square)-এর। চার বন্ধুর সমান অংশীদারিত্ব এবং সমতা, নির্ভুলতা ও গুণমান বজায় রাখার অঙ্গীকার থেকেই নামকরণ করা হয়েছিল ‘স্কয়ার’। যাত্রা শুরুর সময় তাঁদের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা ছিল নগণ্য। ১৭ থেকে ২০ হাজার টাকার প্রাথমিক মূলধন, টিনের একটি ছোট্ট ঘর এবং সামান্য কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে উৎপাদিত হয় তাঁদের প্রথম ওষুধ ‘ইস্টন সিরাপ’।
প্রথম দুই বছর ব্যবসায়ে লাভের মুখ দেখা যায়নি। অংশীদারদের নিজেদের পকেট থেকেই বাড়তি টাকা ঢালতে হয়েছিল। তৃতীয় বছরে বিনিয়োগ বেড়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকায় পৌঁছায় এবং চতুর্থ বছরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো মুনাফা অর্জন করতে শুরু করে।
সেই সাধারণ সূচনা থেকেই সময়ের পরিক্রমায় গড়ে উঠেছে স্কয়ার গ্রুপ। আতাইকুলার কারখানা থেকে শুরু হওয়া এই শিল্পধারা কেবল ওষুধেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পর্যায়ক্রমে তা বিস্তৃত হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা, প্রসাধন ও ভোগ্যপণ্য, টেক্সটাইল, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং গণমাধ্যম খাতে।
ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে স্যামসন এইচ চৌধুরী সততা, সময়ানুবর্তিতা ও কঠোর নীতিবোধের সঙ্গে কখনো আপস করেননি। তাঁর মতে, ব্যবসায় মুনাফা অর্জন করাই শেষ কথা হতে পারে না; গ্রাহকের সন্তুষ্টি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনও একজন ব্যবসায়ীর প্রধান কর্তব্য। এই নীতিবোধের কারণেই দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তিনি লাভ করেছিলেন সর্বজনীন শ্রদ্ধা। ১৯৮৫ সালে আতাইকুলায় দুস্থ ও অনাথ শিশুদের সুবিধার্থে একটি অনাথাশ্রম স্থাপনসহ নানাবিধ জনকল্যাণমূলক কাজে তাঁর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল।
কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৮ সালে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ তাঁকে ‘বিজনেস এক্সিকিউটিভ অব দ্য ইয়ার’ এবং ২০০০ সালে ডিএইচএল ওয়ার্ল্ডওয়াইড এক্সপ্রেস তাঁকে ‘বিজনেস পারসন অব দ্য ইয়ার’ সম্মানে ভূষিত করে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিজের শিকড় ও পাবনার মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা বজায় রেখেছিলেন।
২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি ৮৬ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি উদ্যোক্তা। বস্তুগত সম্পদ বা বিশাল শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চেয়েও তিনি রেখে গেছেন তাঁর নীতি, আদর্শ ও সততার অনন্য এক উত্তরাধিকার, যা তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য চিরকাল অনুপ্রেরণা জোগাবে।









