,

স্মরণে-একাত্তরের জননী: অদম্য জীবনসংগ্রামী ও বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরীর উপাখ্যান

ইতিহাসের পাতায় কিছু মানুষের জীবন কেবল ব্যক্তিগত গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে একটি পুরো জাতির আত্মত্যাগের প্রতীক। রমা চৌধুরী ছিলেন তেমনই এক অনন্য নারী—যিনি একাত্তরের বীরাঙ্গনা, শিক্ষাব্রতী, লেখক এবং এক অদম্য জীবনসংগ্রামী হিসেবে আজীবন লড়ে গেছেন। তাঁর জীবন কেবল নির্যাতন কিংবা সন্তানহারা এক মায়ের কান্না নয়, বরং তা নিঃস্বতার সঙ্গে লড়াই এবং আত্মমর্যাদা আঁকড়ে বেঁচে থাকার এক অসামান্য আখ্যান। তাঁকে মানুষ সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে ‘একাত্তরের জননী’ হিসেবে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রমা চৌধুরী তিন শিশুপুত্রের মা হিসেবে পৈতৃক ভিটা চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে অবস্থান করছিলেন। তাঁর স্বামী তখন ভারতে চলে যান। সেই ভয়াল ১৩ মে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় তাঁর বাড়িতে হামলা চালায়। তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্জন স্থানে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়। কোলের শিশুসন্তান তখন তাঁর সঙ্গেই ছিল। সম্ভ্রম হারানোর পর আত্মরক্ষার জন্য তিনি পুকুরে গিয়ে লুকিয়ে থাকলেও রক্ষা পাননি। হানাদাররা গানপাউডার দিয়ে তাঁর ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, যার ফলে নিমিষেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় তাঁর সংসার ও জীবনের বহু মূল্যবান স্মৃতি। এরপর মুক্তিযুদ্ধের বাকি মাসগুলোতে তিন শিশুসন্তান ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে তাঁকে জলে-জঙ্গলে এবং খোলা আকাশের নিচে লুকিয়ে কাটাতে হয়। এই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর অমর গ্রন্থ ‘একাত্তরের জননী’ লেখার মূল প্রেরণা হয়ে ওঠে।
যুদ্ধ শেষ হলেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে শান্তির সুবাতাস বইেনি। বিজয়ের প্রাক্কালে ২০ ডিসেম্বর মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁর ছোট ছেলে সাগর মারা যায়। এর কিছুদিন পর ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অপর সন্তান টগরও মাত্র তিন বছর বয়সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। নিজের সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে অসাবধানতাবশত তার শ্বাসরোধ হয়ে যাওয়ার সেই বেদনাদায়ক ঘটনা তাঁকে আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। পরবর্তীকালে দ্বিতীয় সংসারের সন্তান দীপঙ্কর টুনু ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। একে একে তিন সন্তানকেই হারিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েন। সন্তানদের দাহ না করে মাটিতে সমাহিত করার কারণে তিনি দীর্ঘদিন জুতো পরা থেকে বিরত থাকেন। তৃতীয় সন্তান টুনুর মৃত্যুর পর প্রায় ১৫ বছর তিনি খালি পায়ে হেঁটেছেন, যা ছিল মাতৃত্বের অসীম শোক ও একাত্তরের স্মৃতি বয়ে চলার এক নীরব প্রতীক।
স্বাধীনতার পর তাঁর জীবন ছিল চরম দারিদ্র্য ও নিঃসঙ্গতার সঙ্গে লড়াইয়ের নাম। তবে তিনি কখনো কারও কাছে হাত পাতেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী একজন নারী হয়েও তিনি নিজের লেখা বই নিজেই ফেরি করে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে—
  • একাত্তরের জননী
  • এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য
  • ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ
  • আগুনরাঙা আগুনঝরা
  • অশ্রুভেজা একটি দিন
  • স্মৃতির বেদন অশ্রু ঝরায়
  • চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবন-দর্শন
  • রবীন্দ্র সাহিত্যে ভৃত্য
  • নজরুল প্রতিভার সন্ধানে
  • সেই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে মরণোত্তর বেগম রোকেয়া পদক প্রদান করা হয়। রমা চৌধুরী চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর খালি পায়ের ছাপ, কলমের অক্ষরের ইতিহাস এবং আত্মমর্যাদার দীপ্তি আমাদের জাতীয় চেতনায় চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।
Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক । জিলাইভ বাংলা

https://bn.glive24.com/

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।