ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নাশকতার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সতর্ক করেছে দেশটির নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা। ডেনিশ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার পাল্টা গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান এমিল গ্রেসহোম জানিয়েছেন, বিষয়টি কেবল সম্ভাব্য ঝুঁকি নয়; বরং ডেনমার্কের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নাশকতার পরিকল্পনা ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আনাদোলু এজেন্সি জানায়, ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডেনিশ প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষভাবে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ডেনিশ সংবাদমাধ্যম বার্লিংস্কে ও ডিআরকে দেওয়া বক্তব্যে গ্রেসহোম বলেন, রুশ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সম্ভাব্য নাশকতার ধরন হিসেবে অগ্নিসংযোগের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন ও প্রস্তুতির মাত্রা এতটাই নির্দিষ্ট যে বিষয়টি নিয়ে জনসাধারণকে সতর্ক করা প্রয়োজন বলে মনে করেছে গোয়েন্দা সংস্থা।
ডেনিশ কর্তৃপক্ষের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, রাশিয়ার হয়ে কাজ করার জন্য সাধারণ নাগরিকদের আকৃষ্ট বা নিয়োগের চেষ্টা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন মাধ্যমে ডেনিশ নাগরিকদের এমন কিছু কাজের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, কারখানা বা স্থাপনার ছবি ও ভিডিও ধারণ এবং সেখানকার প্রবেশপথ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থার আশঙ্কা, এসব তথ্য পরবর্তী সময়ে নাশকতার পরিকল্পনায় ব্যবহার করা হতে পারে।
ডেনমার্কের নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে দেশটির প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। নির্বাচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পসংগঠনকেও ইতোমধ্যে সম্ভাব্য হুমকি এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে।
ড্যানিশ শিল্প মালিকদের সংগঠনের সমাজনিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান রাসমুস অ্যান্ডারস্কভ প্রতিরক্ষা শিল্পের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, তালাব্যবস্থা, নজরদারি, আলোকসজ্জা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কার কী দায়িত্ব থাকবে—এসব বিষয় পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, দেশের ব্যবসায়িক খাতের তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান এই সতর্কতার আওতায় পড়ছে।
ডেনমার্কের নিরাপত্তা সংস্থার মতে, ইউরোপে রাশিয়ার কথিত নাশকতামূলক তৎপরতার ঝুঁকি সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। সংস্থাটি আগে জানিয়েছিল, ইউক্রেনের জন্য নির্দিষ্ট সরবরাহ ব্যাহত করা এবং ইউরোপীয় সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করা এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে। তবে ডেনমার্কে রাশিয়ার পক্ষ থেকে সরাসরি শারীরিক নাশকতার কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার তথ্য বর্তমানে তাদের হাতে নেই।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরাও বিষয়টিকে ইউরোপের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির অংশ হিসেবে দেখছেন। ড্যানিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ফ্লেমিং স্প্লিডসবোয়েল এই হুমকিকে নাশকতার ক্ষেত্রে নতুন ও আরও জটিল মাত্রার ইঙ্গিত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সাবেক সামরিক গোয়েন্দা বিশ্লেষক জ্যাকব কার্সবো মনে করেন, ডেনিশ কর্তৃপক্ষের প্রকাশ্য সতর্কবার্তা রাশিয়ার প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে।
এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নাশকতা ও অন্যান্য গোপন তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই ডেনমার্কের এই সতর্কতা সামনে এসেছে। ডেনিশ গোয়েন্দা সংস্থা বলছে, রাশিয়ার তৎপরতার পরিধি ও জটিলতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। ফলে প্রতিরক্ষা শিল্পের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ নাগরিকদেরও সন্দেহজনক যোগাযোগ ও অস্বাভাবিক তথ্য সংগ্রহের অনুরোধের বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।










