দেশের উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ: উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’র আওতায় নির্বাচিত প্রত্যেক উদ্যোক্তা তাঁর প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন পাবেন। এই অর্থের অর্ধেক ব্যাংকঋণ এবং বাকি অর্ধেক অনুদান হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান, সহকারী পরিচালক শাহরিয়ার সিদ্দিকীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা হবে। এর উদ্দেশ্য হলো রাজধানী বা বড় শহরকেন্দ্রিক উদ্যোক্তা তৈরির বাইরে দেশের প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যায়েও নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করা।
অনেক তরুণের ব্যবসা করার আগ্রহ ও কার্যকর ধারণা থাকলেও প্রাথমিক মূলধনের অভাবে তাঁরা উদ্যোগ শুরু করতে পারেন না। আবার ব্যবসা শুরু করলেও পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে সেটি বড় করতে পারেন না। নতুন এই কর্মসূচির মাধ্যমে এমন সম্ভাবনাময় তরুণদের চিহ্নিত করে অর্থায়নের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
উপজেলা থেকেই খুঁজে নেওয়া হবে উদ্যোক্তা
কর্মসূচির আওতায় তফসিলি ব্যাংকগুলো তাদের বিদ্যমান শাখা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা খুঁজে বের করবে। ফলে উদ্যোক্তা নির্বাচন শুধু ব্যাংকের কাছে আসা আবেদনকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ শনাক্ত করার সুযোগও তৈরি হবে।
তবে শুধু ব্যবসার আগ্রহ থাকলেই অর্থায়ন পাওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক ধারণা, উদ্যোগের সম্ভাবনা এবং প্রকৃত অর্থের প্রয়োজন যাচাই করা হবে। এসব বিষয় বিবেচনা করে অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।
নির্বাচিত একজন উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার অর্থায়ন প্যাকেজ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এর সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা থাকবে ব্যাংকঋণ হিসেবে এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে অনুদান হিসেবে। তবে প্রত্যেক উদ্যোক্তাকে যে ২০ লাখ টাকা করেই দেওয়া হবে, বিষয়টি এমন নয়। উদ্যোক্তার প্রকৃত অর্থের চাহিদা ও ব্যবসার প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারিত হবে।
কম সুদে ঋণ, লাগবে না সহায়ক জামানত
কর্মসূচিটির অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো ঋণের সুদ বা মুনাফার হার। গ্রাহক পর্যায়ে এ হার সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তুলনামূলক কম খরচে ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকায় নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণের আর্থিক বাধা কিছুটা কমতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, ঋণের বিপরীতে কোনো সহায়ক জামানত প্রয়োজন হবে না। নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের অন্যতম বড় বাধা হচ্ছে গ্রহণযোগ্য জামানতের অভাব। বিশেষ করে তরুণদের অনেকের নিজস্ব সম্পদ বা ব্যাংকের কাছে গ্রহণযোগ্য সম্পদ না থাকায় তাঁরা প্রচলিত ঋণ সুবিধা নিতে পারেন না। এই কর্মসূচিতে জামানতের বাধা না থাকায় তাঁদের জন্য ব্যাংক অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে।
তবে জামানত না থাকলেও ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব থাকবে উদ্যোক্তার ওপর। কর্মসূচিটি অনুদাননির্ভর কোনো বিনামূল্যের অর্থ সহায়তা নয়; বরং ঋণ ও অনুদানকে একসঙ্গে যুক্ত করে উদ্যোক্তাকে ব্যবসা দাঁড় করানোর সুযোগ দেওয়ার একটি কাঠামো।
ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অনুদানও ফেরত দিতে হবে
সুবিধার পাশাপাশি কর্মসূচিতে কঠোর শর্তও রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে উদ্যোক্তাকে দেওয়া অনুদানের অর্থও সুদবিহীন ঋণে রূপান্তরিত হবে। অর্থাৎ শুরুতে যে অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেটিও পরিশোধযোগ্য দায়ে পরিণত হবে।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ঋণ হিসাব প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী শ্রেণীকৃত হবে এবং খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ফলে ওই উদ্যোক্তা পরবর্তী সময়ে নতুন ঋণ পাওয়ার যোগ্যতাও হারাবেন।
এই শর্তের ফলে কর্মসূচিতে সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার চাপও থাকবে। ব্যবসায় বিনিয়োগের পর আয় সৃষ্টি করে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতে হবে। অন্যথায় অনুদানের সুবিধাও স্থায়ী থাকবে না।
স্থানীয় অর্থনীতিতে বাড়তে পারে কর্মসংস্থান
উপজেলা পর্যায়ে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগটি সফল হলে এর প্রভাব শুধু উদ্যোক্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত হলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্থানীয় পণ্য ও সেবার বাজার সম্প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি সরবরাহকারী, পরিবহন ও অন্যান্য সহায়ক ব্যবসারও চাহিদা বাড়তে পারে।
বিশেষ করে কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র উৎপাদন, সেবা এবং স্থানীয় বাজারভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগে তরুণদের সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কোন কোন খাতে অর্থায়ন হবে, তার নির্দিষ্ট তালিকা এই তথ্যের ভিত্তিতে বলা যাচ্ছে না। উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক ধারণা ও প্রকৃত অর্থের প্রয়োজন যাচাই করেই অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ কর্মসূচির আরেকটি সুবিধা হলো, উদ্যোক্তা খুঁজতে ব্যাংকের বিদ্যমান শাখা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হবে। ফলে উপজেলা পর্যায়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে সম্ভাবনাময় তরুণদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ বাড়বে।
তবে উদ্যোগটির সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে উদ্যোক্তা বাছাই ও অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর। ব্যবসার সম্ভাবনা যাচাই না করে শুধু অর্থ বিতরণ করা হলে ঋণখেলাপির ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিপরীতে ব্যবসার ধারণা, বাজারের সম্ভাবনা এবং উদ্যোক্তার সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করে অর্থায়ন করা গেলে উদ্যোগটি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে।
তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অর্থের সংস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই জায়গায় ঋণ ও অনুদানের সমন্বয়ে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার এই অর্থায়ন কর্মসূচি উপজেলা পর্যায়ের সম্ভাবনাময় তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। এখন নজর থাকবে, ব্যাংকগুলো কীভাবে উদ্যোক্তা নির্বাচন করে, অর্থায়ন কতটা স্বচ্ছভাবে হয় এবং নির্বাচিত উদ্যোক্তারা সেই অর্থ ব্যবহার করে কতটা টেকসই ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন।










