একটি স্বাধীন ও সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ (Civil Society), নারী অধিকার ফোরাম ও স্বায়ত্তশাসিত প্রগতিশীল প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মগুলো (যেমন: আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, মুক্তচিন্তার লেখক-শিল্পী সংঘ) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্বৈরাচারী প্রবণতা এবং মৌলবাদী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নাগরিকদের প্রধান সুরক্ষাবর্ম হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ধর্মীয়করণের অন্ধকার যুগে এদেশের সুশীল সমাজ ও প্রগতিশীল নাগরিক জোটগুলোই মানবাধিকার, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সেক্যুলার চেতনার শিখাটি জ্বালিয়ে রেখেছিল।
কিন্তু আহমদ সফা যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিকতার বিচারে নামেন, তখন তিনি কোনো ক্ষমতার বস্তুনিষ্ঠ মার্কসবাদী বা প্রগতিশীল ব্যবচ্ছেদ করেননি। সফা ক্ষমতার সমালোচনার চতুর মোড়কে নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংস্থা ও প্রগতিশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে “এলিট ষড়যন্ত্র”, “ইউরোপীয় এনজিওর দালাল” এবং “জনবিচ্ছিন্ন সুশীল সুবিধাবাদ” হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন। সফা প্রগতির প্রচ্ছদ পরে যে উগ্র ‘সুশীল সমাজ-বিদ্বেষ’ ছড়িয়েছিলেন, তা রাষ্ট্রকে সাম্যবাদী করেনি; বরং প্রগতিশীলতার নীতিগত ভিত্তিকেই সাধারণ মানুষের চোখে সন্দেহভাজন ও অনৈতিক করে তুলেছিল। এই পর্বের মূল ময়নাতদন্ত হলো: মানবাধিকার ও সুশীল সমাজকে ধূলিসাৎ করে সফার তৈরি করা এই জনঅবিশ্বাস শেষ পর্যন্ত কার লাভ সাধন করেছে এবং কীভাবে তা সরাসরি উগ্র মৌলবাদী ও ডানপন্থী শক্তিগুলোর জনসংযোগ ও সামাজিক আধিপত্যকে সহজ করে দিয়েছে।
১. মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজকে ‘এলিট চক্রান্ত’ বানানোর ছফীয় রাজনীতি
আহমদ সফা তাঁর ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’, ‘রাজনীতি ও সংস্কৃতি’ এবং বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক কলামে নাগরিক সমাজ ও সুশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর তীব্র চরিত্রহনন করেছেন। সফার তাত্ত্বিক ফ্রেমটি ছিল অত্যন্ত পপুলিস্ট: তিনি দেখিয়েছেন যে, এদেশের সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা নাকি “ইংরেজি জানা, কফি খাওয়া, বিদেশি টাকায় চলা এমন এক এলিট গোষ্ঠী”—যাদের সাথে এদেশের “ঈমানদার ও টুপি-পরা সাধারণ মানুষের” কোনো আত্মিক সম্পর্ক নেই!
“আমাদের দেশের এনজিও পরিচালিত সুশীল সমাজ এবং মানবাধিকারের দোকানদাররা মূলত পশ্চিমের সাগরেদ। তারা যে মানবাধিকারের জিকির তোলে, তা এদেশের প্যান্ট-পরা, ব্লেজার-পরা একমুষ্টি শহুরে বুরজোয়ার বিনোদন। এদেশের কোটি কোটি মুসলিম কৃষক-শ্রমিকের ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও ঈমানী অনুভূতির সাথে এই বিলাসী সুশীলতার কোনো যোগসূত্র নেই। এরা বিদেশি প্রভুদের ডলার খেয়ে দেশের ভেতর সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ চালাচ্ছে।”
এই যুক্তির তাত্ত্বিক অসাধুতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা বিশ্লেষণ করা জরুরি:
- মানবাধিকারের সার্বজনীনতাকে লঘু করা: মানবাধিকার ও আইনের শাসন কোনো “বিদেশি বিলাসিতা” নয়; তা হলো রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে একজন সাধারণ নাগরিকের শেষ আশ্রয়। সফা তাকে “বিদেশি প্রভুদের ডলার খেয়ে চালানো ব্যবসা” বলে গালি দিয়ে মানবাধিকারের সার্বজনীন নৈতিক ভিত্তিকে সাধারণ মানুষের চোখে অপরাধী সাব্যস্ত করলেন।
- মৌলবাদী ও সামরিক শাসকদের সুবিধাজনক অবস্থান: জিয়াউর রহমান, এরশাদ বা উগ্র ধর্মীয় দলগুলো যখনই প্রগতিশীল সুশীল সমাজের তোপের মুখে পড়েছে, তখনই তারা সফার এই একই যুক্তির আশ্রয় নিয়েছে—”এরা সুশীল, এরা বিদেশি এনজিওর দালাল, এরা ইসলামের শত্রু!”
২. ছফীয় ‘সুশীল-বিদ্বেষ’ বনাম মৌলবাদী জনসংযোগের পথ সুগমকরণ
সফা নিজেকে “ক্ষমতার বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে থাকা বিদ্রোহী” হিসেবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করতেন। কিন্তু তাঁর এই ‘সুশীল-বিদ্বেষী’ পপুলিজমের লাভবান হয়েছিল কে?
যখন প্রগতিশীল সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের কাছে “ভ্রষ্ট, সুবিধাভোগী ও বিদেশি এজেন্ট” হিসেবে খাড়া করা হয়, তখন সমাজে নীতি ও নৈতিকতার একমাত্র বিকল্প হিসেবে নিজেদের উপস্থাপনের বিশাল সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যায় উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো (যেমন: জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির, ওয়াজ মাহফিলের বক্তা ও পরবর্তীতে হেফাজতে ইসলাম)।
[নাগরিক সমাজ বিচারে দুই বিপরীত তাত্ত্বিক অবস্থান]
│
┌───────────────────────────────┴───────────────────────────────┐
▼ ▼
[প্রগতিশীল নাগরিক সমাজ মডেল] [ছফীয় অ্যান্টি-সুশীল পপুলিস্ট মডেল]
• সুশীল সমাজ রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচার ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ঢাল • সুশীল সমাজ হলো 'বিদেশি প্রভুদের ডলারখোর এলিট ষড়যন্ত্র'
• মানবাধিকার, সেক্যুলার আইন ও নারী অধিকার রক্ষা প্রধান উদ্দেশ্য • সাধারণ মানুষের 'ঈমানী অনুভূতির বিরুদ্ধে সেক্যুলার চক্রান্ত'
• প্রগতিশীল ভাবাদর্শের নীতিগত ও নৈতিক ভিত্তি জোরদারকরণ • প্রগতিশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক মর্যাদা ধূলিসাৎকরণ
*ফলাফল:* সুরক্ষিত মৌলিক নাগরিক অধিকার ও সেক্যুলার প্রতিরোধ *ফলাফল:* মৌলবাদী ও উগ্র ডানপন্থী বলয়ের সহজ জনসংযোগ ও সামাজিক দখল
সফা ‘যদ্যপি আমার গুরু’ এবং অন্যান্য লেখায় প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক জোটগুলোকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে দাবি করেছেন যে, এরা কেবল “পুরস্কার ও পদের লোভে সেক্যুলারিজমের নাটক করে”।
এর রাজনৈতিক পরিণতি দাঁড়ায় ভয়াবহ:
১. প্রগতিশীল প্রতিষ্ঠানের নৈতিক পতন ঘটানো: সাধারণ মানুষ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করল যে প্রগতিশীল সুশীল সমাজ মানেই “ডলারখোর সুবিধাবাদী”, তখন তারা প্রগতিশীল রাজনীতির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলল।
২. মৌলবাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি: সেক্যুলার সুশীল সমাজকে খালি করে দেওয়া জায়গায় মৌলবাদীরা নিজেদের “একমাত্র নীতিবান, পরোপকারী ও ঈমানদার বিকল্প” হিসেবে তুলে ধরে তাদের এনজিও, হাসপাতাল, ব্যাংক ও সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলল। সফার পপুলিস্ট কুঠার মূলত প্রগতির দুর্গ ভেঙে মৌলবাদের বিজয়ের লাল গালিচা বিছিয়ে দিয়েছিল।
৩. নারী অধিকার ও সেক্যুলার সংস্কারকে ‘পশ্চিমা চক্রান্ত’ বানানোর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রান্ত
এদেশের প্রগতিশীল সুশীল সমাজ ও এনজিওগুলোর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবদান ছিল—গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা, বাল্যবিকাশ ও বাল্যবিয়ে রোধ করা এবং নারী অধিকার রক্ষা করা।
কিন্তু সফা প্রগতিশীল সুশীল সমাজের এই সামাজিক রূপান্তরকেও আক্রমণ করেন। তিনি দাবি করেন যে, সুশীল সমাজের এই নারী অধিকার আন্দোলন নাকি “বাঙালি মুসলিম পরিবার প্রথা ভেঙে দেওয়ার পশ্চিমা ষড়যন্ত্র”!
সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিয়ে লিখেছেন:
“আমাদের দেশের সুশীল সমাজ ও নারী অধিকারবাদীরা যেভাবে পশ্চিমা মূল্যবোধ চাপিয়ে দিতে চায়, তা এদেশের মুসলিম পারিবারিক কাঠামো ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর এক ভয়াবহ আঘাত। এরা দারিদ্র্য বিমোচনের নামে আসলে ধর্মীয় অবচেতনকে বিনাশ করতে চায়।”
হুবহু এই যুক্তিটিই কিন্তু পরবর্তীতে উগ্র ওয়াজী মোল্লা এবং হেফাজতে ইসলামের ‘১৩ দফা’ দাবিতে উঠে এসেছিল! সফা নারী মুক্তি ও সেক্যুলার সামাজিক সংস্কারকে “পশ্চিমা চক্রান্ত” বলে গালি দিয়ে এদেশের কট্টর পুরুষতান্ত্রিক ও মৌলবাদী শক্তিকেই বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার জোগান দিয়েছেন।
৪. বর্তমান বাংলাদেশে ‘সুশীল-বিদ্বেষ’ ও ডানপন্থী পপুলিজমের রাজত্ব
আজকের বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, রাজনৈতিক মঞ্চ এবং জনপরিসরে যে তীব্র ‘সুশীল-বিদ্বেষ’ বা ‘সুশীল সমাজকে গালাগালি করার সংস্কৃতি’ দেখা যায়, তার প্রধান রূপকার আহমদ সফা।
- ‘সুশীল’ শব্দটিকে গালিতে রূপান্তর: বাংলাদেশে কোনো প্রগতিশীল চিন্তক মানবাধিকার, সেক্যুলারিজম বা সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার কথা বললেই উগ্র ডানপন্থীরা তাঁকে “সুশীল”, “ডলারখোর” বা “শাহবাগী” বলে অপমান করে। এই মানসিকতার জন্ম সফার ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ ও রাজনৈতিক কলামগুলো থেকে।
- মানবাধিকার ধ্বংসের সাফাই: স্বৈরাচারী শাসক বা মৌলবাদী চক্র যখনই মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ বা নিপীড়ন করতে চায়, তারা সফার তৈরি করা এই বয়ানটিই সামনে আনে—”এরা দেশের শত্রু, এরা এনজিওর দালালি করছে।”
প্রগতির প্রচ্ছদে ফ্যাসিবাদী পপুলিজম
আহমদ সফা রাষ্ট্রীয় সমালোচনার ছদ্মবেশে যা করেছেন, তা কোনো রাজপথের বৈপ্লবিক জনবান্ধব রাজনীতি ছিল না; তা ছিল প্রগতিশীলতার নীতিগত ভিত্তিমূল কেটে ফেলার চতুর খেলা।
তিনি প্রগতিশীল সুশীল সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন ও মুক্তচিন্তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের কাছে “সুবিধাবাদী ও বিদেশি এজেন্ট” হিসেবে চিত্রায়িত করে সাধারণ মানুষের মনে সেক্যুলার রাজনীতির প্রতি গভীর জনঅবিশ্বাস সৃষ্টি করেছেন। সফার আক্রমণ রাষ্ট্রযন্ত্রকে একচুলও নড়াতে পারেনি; কিন্তু তা সেক্যুলার নাগরিক সমাজের মেরুদণ্ডটি ভেঙে দিয়েছে। এর ফলে এদেশের রাজনৈতিক ময়দানে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, তাতেই আজ উগ্র ডানপন্থা, ধর্মীয় মৌলবাদ ও মেজোরিটারিয়ান সামাজিক ট্রাইবালইজম পরম নিশ্চিন্তে রাজত্ব করছে। আহমদ সফার এই ‘সুশীল-বিদ্বেষী’ ছদ্ম-বিপ্লবী মুখোশ খুলে না ফেললে এদেশের সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক নাগরিক সমাজকে পুনর্বাসিত করা অসম্ভব।







