,

‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’: প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের চরিত্রহনন ও শূন্যতা সৃষ্টি । ছফামন পর্ব ১৬

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রাক্কালে পাকিস্তানি আল-বদর ও ঘাতক বাহিনী মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, গোবিন্দচন্দ্র দেব, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মতো অগ্রগণ্য সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল নতুন রাষ্ট্রকে চিন্তাগতভাবে পঙ্গু করে দেওয়া। স্বাধীনতার পর রক্তস্নাত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যে কজন প্রগতিশীল, সেক্যুলার ও বামপন্থী বুদ্ধিজীবী বেঁচে ছিলেন, তাঁদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানি ফ্যাসিবাদের চিন্তা-অবকাঠামো ধ্বংস করে একটি বৈজ্ঞানিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সাম্যবাদী সমাজ গঠনের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দেওয়া।

কিন্তু ১৯৭২ সালেই আহমদ সফা প্রকাশ করেন তাঁর বহুল আলোচিত ও প্রচারিত বই ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’। এই বইটিতে সফা পাকিস্তানি মতাদর্শের অবশিষ্টাংশ বা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ওপর আঘাত হানার বদলে তাঁর সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তিক কামান দাগেন এদেশের সেক্যুলার, প্রগতিশীল ও বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে। সফা ১৯৭১-পরবর্তী প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ঢালাওভাবে “সুবিধাবাদী”, “পরজীবী”, “পুরস্কারলোভী” এবং “ভারতের এজেন্ট” বলে চরিত্রহনন করেন। এই পর্বের মূল অন্বেষণ হলো: কীভাবে সফা প্রগতির প্রচ্ছদ পরে উগ্র ‘বুদ্ধিজীবী-বিদ্বেষ’ (Anti-Intellectualism)-এর বিষবাষ্প ছড়িয়ে প্রগতিশীল বলয়কে ধ্বংস করেছিলেন এবং এমন একটি বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা (Intellectual Vacuum) তৈরি করেছিলেন, যার সুযোগ নিয়ে পরবর্তীতে উগ্র ডানপন্থী ও রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা সহজেই এদেশের সামাজিক অক্ষে ঘাঁটি গাড়তে পেরেছে।

১. ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’: মুক্তচিন্তা ধ্বংসের পপুলিস্ট কুঠার

‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ বইটিতে সফা এমন এক আক্রমণাত্মক ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল গ্রহণ করেছিলেন, যা প্রগতিশীল চিন্তার বিকাশকে তো সহায়তা করেইনি, বরং সাধারণ মানসে বুদ্ধিজীবীমাত্রেরই নৈতিক মর্যাদা ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল।

সফা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ (১৯৭২) গ্রন্থে লিখছেন:
“বাংলাদেশ স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে উত্তীর্ণ হলো, অথচ আমাদের বুদ্ধিজীবীরা চিরকাল সরকারের ও রাষ্ট্রের উচ্ছিষ্টভোগী হয়েই রইলেন। ১৯৭১ সালে তারা কলকাতায় গিয়ে আরাম-আয়েশে দিন কাটিয়েছেন, আর আজ স্বাধীন বাংলাদেশে পদ, পদবী ও পুরস্কারের জন্য একে অপরের পেছনে ছুরি মারছেন। এরা কোনোদিন জনগণের বন্ধু ছিলেন না, এরা হলেন সুযোগসন্ধানী পরজীবী।”

এই মন্তব্যের কৌশলগত প্রতিক্রিয়াশীলতা ও অসাধুতা চিহ্নিত করা জরুরি:

  • পাইকারি কাদা ছোঁড়াছুড়ি (Blanket Demonization): সফা কোনো নির্দিষ্ট বুদ্ধিজীবীর নীতিহীনতার সুনির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক সমালোচনা করেননি; তিনি ঢালাওভাবে পুরো প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী সমাজকে “উচ্ছিষ্টভোগী” ও “সুবিধাবাদী” হিসেবে দেগে দিয়েছেন।
  • ইতিহাসের সুবিধাজনক বিস্মৃতি: ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের জীবনদান ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের রক্তস্নাত ইতিহাসকে সফা একঝটকায় মুছে দিলেন। তিনি বুদ্ধিজীবীদের এমনভাবে উপস্থাপন করলেন যেন তারা কেবল কফি হাউজে বসে আড্ডা দেওয়া কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত লোক!

২. অ্যান্টি-ইন্টেলেকচুয়ালিজম (Anti-Intellectualism): ফ্যাসিবাদী পপুলিজমের ছফীয় সংস্করণ

বিশ্বইতিহাসে (যেমন: ম্যাককার্থিজম বা প্রাক-ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়) পপুলিস্ট ও উগ্রপন্থীদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হলো অ্যান্টি-ইন্টেলেকচুয়ালিজম বা বুদ্ধিজীবী-বিদ্বেষ। জনগণকে শেখানো হয় যে—পণ্ডিত, অধ্যাপক, বিজ্ঞানী ও সেক্যুলার চিন্তকরা হলো “এলিট, জনগণের শত্রু ও দুর্নীতিগ্রস্ত”, আর একমাত্র কোনো উগ্র পপুলিস্ট নেতাই হলো “জনগণের খাঁটি প্রতিনিধি”।

সফা বাংলাদেশে ঠিক এই অ্যান্টি-ইন্টেলেকচুয়ালিজমের বিষবৃক্ষটি রোপণ করেছিলেন।

                  [বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় দুই বিপরীত তাত্ত্বিক মডেল]
                                         │
         ┌───────────────────────────────┴───────────────────────────────┐
         ▼                                                               ▼
[সেক্যুলার ও বস্তুনিষ্ঠ চিন্তার মডেল]                           [ছফীয় অ্যান্টি-ইন্টেলেকচুয়াল মডেল]
• বুদ্ধিজীবীদের সামাজিক ভুলভ্রান্তির প্রাতিষ্ঠানিক সমালোচনা          • বুদ্ধিজীবীদের ঢালাও 'সুবিধাবাদী' ও 'ভারতের দালাল' আখ্যা
• মুক্তচিন্তা, গবেষণা ও প্রগতিশীল চিন্তার সুরক্ষা              • পপুলিজমের দোহাই দিয়ে সেক্যুলার চেতনার নৈতিক অবমূল্যায়ন
• প্রতিক্রিয়াশীল ও ধর্মান্ধ ভাবাদর্শের বিরুদ্ধে সংগ্রাম           • বাম ও সেক্যুলার বলয়কে ভেঙে বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা সৃষ্টি
*ফলাফল:* বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিভিত্তিক নাগরিক সমাজ               *ফলাফল:* উগ্র ডানপন্থী ও ইসলামিস্টদের বুদ্ধিবৃত্তিক দখলদারিত্ব
সফা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ গ্রন্থে আরও লিখছেন:
“আমাদের বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশের চিন্তার কারখানাটি নিয়ন্ত্রিত হয় কলকাতা এবং দিল্লি থেকে। তারা নিজেদের স্বাধীন ভাবলেও মূলত ভারতের আধিপত্যবাদী স্বার্থের সাংস্কৃতিক ঝাণ্ডাবাহী।”

এর মাধ্যমে সফা যে কুৎসিত মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ তৈরি করলেন তা হলো: যেকোনো বুদ্ধিজীবী যদি সেক্যুলারিজম, অসাম্প্রদায়িকতা বা প্রগতির কথা বলেন, তবেই তাকে “ভারতের দালাল” বলে স্তব্ধ করে দেওয়া যাবে! উগ্র ডানপন্থীদের এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারত?

৩. প্রগতিশীল বলয় ধ্বংস ও উগ্র ডানপন্থীদের ঘাঁটি গাড়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত

সফার এই ‘বুদ্ধিজীবী-বিদ্বেষী’ আক্রমণের সরাসরি ঐতিহাসিক পরিণতি দাঁড়ায় ভয়াবহ।

১. প্রগতিশীল বলয়ের আত্মরক্ষামূলক পক্ষাঘাত: স্বাধীনতার পরপরই তরুণ প্রজন্মকে সেক্যুলার ও বামপন্থী ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ করার বদলে সফা তাদের শেখালেন যে—প্রগতিশীল অধ্যাপকেরা সবাই “বিক্রিত”। ফলে তরুণ সমাজের একটি বিশাল অংশ সেক্যুলার চিন্তার প্রতি আস্থা হারিয়ে চরম হতাশা ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়।

২. বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা (Intellectual Vacuum) তৈরি: যখন একটি সমাজে প্রগতিশীল ও সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের নৈতিকভাবে দেউলিয়া বলে প্রচার করা হয়, তখন সমাজে যে চিন্তার শূন্যতা তৈরি হয়, তা কখনো ফাঁকা থাকে না।

৩. উগ্র ডানপন্থীদের পুনর্বাসন: ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর জামায়াতে ইসলামী, শিবিরের তাত্ত্বিকেরা এবং সামরিক শাসনের মদদপুষ্ট ডানপন্থী বুদ্ধিজীবীরা (যেমন: ফরহাদ মজহার ও পরবর্তীকালের ইসলামিস্ট তাত্ত্বিকেরা) ছফীয় ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’-কে তাদের মূল বাইবেল বানিয়ে ফেলে! তারা সফার বই থেকে বাক্য উদ্ধৃত করে বলতে শুরু করে: “প্রগতিশীল ও সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা যে ভারতের দালাল ও দুর্নীতিগ্রস্ত, তা তো আপনাদের প্রগতিশীল আহমদ সফাই বলে গেছেন!”

৪. বর্তমান বাংলাদেশে ‘সুশীল-বিদ্বেষ’ ও ফ্যাসিবাদের ছফীয় উৎস

আজকের বাংলাদেশে সেক্যুলার চিন্তক, সুশীল সমাজ ও শিক্ষক-গবেষকদের ওপর যে লাগাতার উগ্র আক্রমণ চালোনো হয় এবং “শাহবাগী”, “সুশীল”, “ভারতের এজেন্ট” বলে গালি দেওয়া হয়—তার একমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক রূপকার আহমদ সফা।

  • সুশীল সমাজকে গালাগালির সংস্কৃতি: সমাজে মুক্তচিন্তার প্রবক্তাদের অপমানিত করার জন্য সফা যে ভাষা ব্যবহার করেছিলেন (‘উচ্ছিষ্টভোগী’, ‘দালানিলানি’, ‘পরজীবী’), সেই একই ভাষা আজ উগ্র মৌলবাদী ও ডানপন্থী প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে অবিরত বর্ষিত হয়।
  • বিজ্ঞান ও মুক্তচিন্তার প্রতি অনাস্থা: সফার অ্যান্টি-ইন্টেলেকচুয়ালিজমের কারণে এদেশের সাধারণ মানুষের একাংশের মনে বিচার-বুদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রগতিশীল গবেষণার প্রতি এক তীব্র ক্ষোভ ও অনাস্থা তৈরি হয়েছে—যা সমাজকে অন্ধ ধর্মান্ধতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রগতির প্রচ্ছদে চরম প্রতিক্রিয়াশীলতা

আহমদ সফা নিজেকে “বুদ্ধিজীবীদের অন্যায়-দুর্নীতির বিরুদ্ধে একমাত্র আপসহীন স্বাধীন কণ্ঠস্বর” হিসেবে জাহির করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বিচারে দেখা যায়, তাঁর এই আক্রমণ কোনো বৈপ্লবিক প্রগতিশীল শুদ্ধি অভিযান ছিল না।

‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ ছিল মূলত প্রগতিশীল ও সেক্যুলার চিন্তাধারাকে পঙ্গু করার এক ট্রোজান হর্স (Trojan Horse)। সফা স্বাধীনতার পরপরই এদেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী বলয়কে আক্রমণ করে তার নৈতিক ভিত্তি ভেঙে দিয়েছিলেন। এর ফলে যে বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতার জন্ম হয়েছিল, তাতেই পরবর্তীতে উগ্র ডানপন্থা, সামরিক তোষণনীতি ও ধর্মীয় সামাজিক ট্রাইবালইজম অত্যন্ত সহজে এদেশের সংস্কৃতির ওপর চেপে বসতে পেরেছে। আহমদ সফা বুদ্ধিজীবীদের বিন্যাস করেননি; তিনি এদেশের সেক্যুলার বুদ্ধিবৃত্তির মেরুদণ্ডটিকেই ভেঙে দিয়ে গেছেন।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।