সুমাত্রায় ঝড় ও বন্যায় ভয়াবহ দুর্যোগ, মৃত্যু ৭০০–র বেশি

ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে ক্রান্তীয় ঝড়ের প্রভাবে টানা প্রবল বর্ষণ নেমে আসায় সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৭০০ জনেরও বেশি মানুষ। বিস্তীর্ণ জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০০৪ সালের সুনামির পর এটি সুমাত্রায় সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

দুর্যোগটি শুধু প্রাকৃতিক নয়, মানবসৃষ্ট কারণও এর তীব্রতা বাড়িয়েছে—এমন মত জোরালো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বিচার বন উজাড় ও পাহাড় কাটা এই বিপর্যয়ের মাত্রা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। সুমাত্রার বিভিন্ন এলাকায় নদীর তীর ও পাহাড়ি ঢালে দীর্ঘদিন ধরে গাছ কাটা হয়েছে; ফলে অতিবৃষ্টির সময় মাটি ধরে রাখার শক্তি হারিয়েছে ভূমি, দ্রুত নেমে এসেছে ভূমিধস।

তাপানুলি অঞ্চলের এক অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা রেলিওয়াতি সিরেগার বলেন, তাঁর বাড়ির আশপাশের বন কেটে নেওয়ার পর থেকেই এলাকাটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ক্ষোভের সুরে তিনি বলেন, “দুষ্ট লোকেরা গাছ কেটে নিয়েছে। তারা বনের গুরুত্ব বোঝে না। আজ আমরা তার মূল্য দিচ্ছি।” তাঁর ভাষ্যমতে, ভূমিধসে বহু বাড়িঘর মাটিচাপা পড়েছে, রাস্তাঘাট ধ্বংস হওয়ায় উদ্ধারকর্মীদের পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্যার পানিতে ভেসে আসা অসংখ্য গাছের গুঁড়ি নদী ও উপকূলীয় এলাকায় জমে নতুন বিপদের সৃষ্টি করেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট প্রাণহানির প্রায় এক-চতুর্থাংশ ঘটেছে তাপানুলিতেই। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, অতিবৃষ্টি এবং দুর্বল অবকাঠামো—এই তিনের সমন্বয়ে অঞ্চলটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৬২ বছর বয়সী সিরেগার আরও বলেন, “বৃষ্টি বন্যা ঘটাতে পারে, কিন্তু এত গাছের গুঁড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা শুধু বৃষ্টির নেই। বৃষ্টি গাছ উপড়ে ফেলে না—মানুষই তা করে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুমাত্রা দীর্ঘদিন ধরেই বন উজাড়ের চাপে আছে। কৃষি সম্প্রসারণ, বাণিজ্যিক কাঠ আহরণ এবং খনিজ অনুসন্ধানের কারণে বনভূমি কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিক পানি শোষণব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রান্তীয় অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনও বদলাচ্ছে—স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি নামছে, যা পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ায়।

সরকার দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের মোতায়েন করেছে। হেলিকপ্টার দিয়ে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো হচ্ছে, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে ধ্বংস হওয়া সড়ক ও সেতুর কারণে উদ্ধারকাজ এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে।

নিচের সারণিতে সুমাত্রার কয়েকটি প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের চিত্র সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

অঞ্চলক্ষতির ধরনপ্রধান সমস্যা
তাপানুলিভূমিধস ও বন্যাবাড়িঘর ধ্বংস, উদ্ধার বিলম্ব
পশ্চিম সুমাত্রাআকস্মিক বন্যাসড়ক-সেতু ভাঙন
উত্তর সুমাত্রানদীভাঙনকৃষিজমি প্লাবিত
উপকূলীয় এলাকাভাসমান গাছের গুঁড়িনৌযান চলাচলে বাধা