বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সংগীত ও খেলাধুলাকে উপেক্ষা করা ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত

অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া এক সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগ স্থগিত করার এই পদক্ষেপ বিভিন্ন মহলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও নীতিমালায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ চললেও মনে রাখতে হবে—গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানুষের অধিকার ও জনস্বার্থ যেন সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকে।

বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে সংগীত ও খেলাধুলার গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এই দুইটি বিষয় শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব গঠন, শৃঙ্খলা, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে। আজকের সময়ের অনেক শিশুই মানসিক চাপে, উদ্বেগে বা বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছে। সেখানে সংগীত ও খেলাধুলা তাদের মন-মেজাজকে সতেজ রাখে, পড়াশোনার চাপ মোকাবিলায় সাহায্য করে এবং সৃজনশীলভাবে নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ দেয়।

বিশ্বের বহু মুসলিম-প্রধান দেশেও সংগীত শিক্ষা পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেমন কুয়েতে দীর্ঘদিন ধরেই সকল বিদ্যালয়ে সপ্তাহে অন্তত একদিন সংগীত ক্লাস বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। ১৯৫৮ সালে দেশটি মিউজিক এডুকেশন সুপারভাইজর অফিস প্রতিষ্ঠা করে এবং আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে সংগীত শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে। তুরস্কেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত বাধ্যতামূলক এবং ২০০৭ সালে তারা তাদের পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন করে, যাতে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আধুনিক পদ্ধতি যুক্ত করা হয়।

বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ইতোমধ্যেই নানা কারণে পিছিয়ে। সেখানে সৃজনশীলতা, ব্যক্তিত্ব গঠন ও চিন্তার স্বাধীনতা তৈরির সুযোগ আরও সীমিত করে দিলে শিক্ষার মান দীর্ঘমেয়াদে আরও অবনতির দিকে যাবে। এই সিদ্ধান্ত সামাজিক বিভাজনও বাড়াতে পারে। দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিশুই সরকারি বিদ্যালয়ের ওপর নির্ভরশীল। সংগীত ও খেলাধুলা বাদ দিলে এসব শিশুর শিক্ষাজীবন এবং সামর্থ্যসম্পন্ন পরিবারের শিশুদের শিক্ষাজীবনের মধ্যে বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ হলো সংগীত। আমাদের লোকজ গান, লালন থেকে শুরু করে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ—এই সৃষ্টিগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে সংযুক্ত করেছে। ঘুমপাড়ানি গান, বিয়ের গান, উৎসবের গান—সবই আমাদের জীবনযাত্রাকে গেঁথে রেখেছে সংগীতের সঙ্গে। তাই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সংগীত বাদ দেওয়া মানে সাংস্কৃতিক শিক্ষা দুর্বল করা। একইভাবে খেলাধুলা আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ। ক্রিকেটে বাংলাদেশ যেভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য এনে দিচ্ছে, তা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছে। কিন্তু স্কুল পর্যায়ে যদি খেলাধুলার সুযোগ কমে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রতিভা উঠে আসবে কীভাবে?

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে সাম্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। তাই এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত নয় যা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বা আনন্দময় শিক্ষাজীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পাঠ্যক্রম এমন হওয়া উচিত যাতে দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও খেলাধুলার ঐতিহ্যকে ধরে রাখা যায়, কারণ এগুলোই সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে।

বিশ্বের মুসলিম-প্রধান দেশগুলো যেখানে সংগীত ও খেলাধুলাকে গুরুত্ব দিয়ে পরিপূর্ণ নাগরিক তৈরি করছে, সেখানে বাংলাদেশ যদি উল্টো পথে হাঁটে—তা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বড় ক্ষতি হবে। সংস্কার প্রয়োজন, কিন্তু সবকিছু বদলে ফেলতে হবে এমন নয়। দীর্ঘদিনের সফল নীতি ও বিষয়গুলো হঠাৎ করে বাদ দেওয়া হলে তা “সংস্কার” নয় বরং “পিছিয়ে যাওয়া” হবে। শিক্ষার কাঠামো আধুনিকীকরণ, গবেষণাভিত্তিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও বেতন উন্নয়ন, সহপাঠ কার্যক্রমে বাজেট বৃদ্ধি—এসবই উন্নয়নের পথ। কিন্তু বিদ্যমান বিষয় বাদ দেওয়া কখনো উন্নয়ন নয়।

সারণী: বিভিন্ন দেশে সংগীত শিক্ষার বিষয়

দেশবৈশিষ্ট্যনীতি/বছর
কুয়েতসাপ্তাহিক বাধ্যতামূলক সংগীত ক্লাস১৯৫৮ সালের অফিস প্রতিষ্ঠা
তুরস্কপ্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক সংগীত২০০৭ সালে নতুন পাঠ্যক্রম
মালয়েশিয়াজাতীয় পাঠ্যক্রমে সংগীত ও সামগ্রিক বিকাশKSSR মানদণ্ড