জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

সংস্কৃতির ধারক হানিফ সংকেত: এক ‘কথার জাদুকর’-এর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তি

বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসের অন্যতম দিকপাল, জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’-র রূপকার ও উপস্থাপক হানিফ সংকেতকে (এ কে এম হানিফ) জাতীয় পর্যায়ে তাঁর অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬’ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ২০২৬) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে আনন্দের জোয়ার। দর্শক ও শুভানুধ্যায়ীদের মতে, সুস্থ বিনোদন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার দীর্ঘ লড়াইয়ে এটি কেবল একজন ব্যক্তির অর্জন নয়, বরং রুচিশীল সংস্কৃতির এক মহা-স্বীকৃতি।


একনজরে হানিফ সংকেত: বহুমুখী প্রতিভার প্রতিকৃতি

হানিফ সংকেত কেবল একজন উপস্থাপক নন, তিনি একাধারে পরিচালক, লেখক, প্রযোজক এবং কণ্ঠশিল্পী। তাঁর সৃজনশীলতার ব্যাপ্তি নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:

ক্ষেত্রবিশেষ অবদান ও উল্লেখযোগ্য কাজ
টেলিভিশন অনুষ্ঠানকালজয়ী ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ (১৯৮৯–বর্তমান)
উপস্থাপনা শৈলীস্বকীয় বাচনভঙ্গি, ছন্দবদ্ধ বাক্য গঠন ও তীক্ষ্ণ রম্যরস
সাহিত্য কর্ম‘চৌচাপটে’, ‘এপিঠ ওপিঠ’, ‘ধন্যবাদ’, ‘অকাণ্ড কাণ্ড’, ‘খবরে প্রকাশ’
নাটক পরিচালনা‘আয় ফিরে তোর প্রাণের বারান্দায়’, ‘দুর্ঘটনা’, ‘শেষে এসে অবশেষে’
পুরস্কার ও সম্মাননাএকুশে পদক (২০১০), জাতীয় পরিবেশ পদক, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার

‘ইত্যাদি’ ও শিকড়ের সন্ধানে যাত্রা

১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে বিটিভিতে প্রথম প্রচারিত হওয়া ‘ইত্যাদি’ আজ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। হানিফ সংকেতের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো অনুষ্ঠানটিকে স্টুডিওর চার দেয়াল থেকে বের করে দেশের প্রান্তিক জনপদে নিয়ে যাওয়া। তিনি প্রতিটি জেলাকে কেন্দ্র করে সেই অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি এবং স্থানীয় সমস্যাগুলোকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরেছেন।

তাঁর মতে, “ফরম্যাট অপরিবর্তিত থাকলেও বিষয়বৈচিত্র্য ও লোকেশনের নতুনত্বই দর্শকদের ধরে রেখেছে।” এই ভ্রমণের মাধ্যমে তিনি একটি অদৃশ্য ‘সাংস্কৃতিক মানচিত্র’ তৈরি করেছেন, যা প্রতিটি বাংলাদেশিকে তাঁর নিজের দেশ সম্পর্কে নতুন করে জানতে সাহায্য করে।

ফজলে লোহানী থেকে উত্তরাধিকার

হানিফ সংকেতের টেলিভিশন ক্যারিয়ারের গোড়াপত্তন হয়েছিল কিংবদন্তি উপস্থাপক ফজলে লোহানীর হাত ধরে। ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের নজর কেড়েছিল। হানিফ সংকেত সবসময়ই ফজলে লোহানীকে তাঁর ‘বন্ধু ও অভিভাবক’ হিসেবে স্মরণ করেন। লোহানীর কাছ থেকেই তিনি শিখেছেন কীভাবে তথ্যের সঙ্গে বিনোদন মিশিয়ে বস্তুনিষ্ঠ বার্তা প্রদান করতে হয়।

সামাজিক সংস্কার ও ‘আলোকিত মানুষ’

‘ইত্যাদি’র একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো সামাজিক প্রতিবেদন। হানিফ সংকেত কেবল অসংগতি তুলে ধরেন না, বরং প্রতিকারের পথও দেখান। সমাজের প্রচারবিমুখ ও নিভৃতে কাজ করা ‘আলোকিত মানুষ’দের তিনি পর্দার সামনে নিয়ে আসেন। তাঁর প্রতিবেদনের প্রভাবে অনেক এলাকায় স্কুল তৈরি হয়েছে, পানির সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং অসহায় মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছে। তাঁর এই সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে ‘আস্থার প্রতীক’ করে তুলেছে।

পুরস্কার উৎসর্গ ও ভবিষ্যৎ অঙ্গীকার

স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তির পর এক আবেগঘন বার্তায় হানিফ সংকেত বলেন, “এই পুরস্কার আমি আমার লক্ষ-কোটি দর্শকদের উদ্দেশে উৎসর্গ করছি। আমৃত্যু আমি সুস্থ সংস্কৃতির চর্চায় দেশের জন্য কাজ করে যেতে চাই।” তিনি বিশ্বাস করেন, নৈতিকতা বজায় রেখেও জনপ্রিয় হওয়া সম্ভব এবং ‘ইত্যাদি’ তার জীবন্ত প্রমাণ।

রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ এই সম্মান প্রাপ্তি আবারও প্রমাণ করল যে—ব্যঙ্গ যখন প্রতিবাদের ভাষা হয় এবং বিনোদন যখন শিক্ষার মাধ্যম হয়, তখন তা দেশ ও জাতির জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে ওঠে। হানিফ সংকেতের এই অর্জন বাংলাদেশের সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চাকে আরও বেগবান করবে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর