শিল্প খাতে স্বল্পসুদে প্রণোদনা ঋণ দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

দেশের শিল্প ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিলের আওতায় উদ্যোক্তারা ৭ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পাবেন বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান

শনিবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, দেশের বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু করা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে উৎপাদন ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে গতি আনতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর জানান, বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘কাউন্টার সাইক্লিক্যাল ইন্টারভেনশন’ নীতির আওতায় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও চাহিদা বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মন্থর হয়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত এমন প্রণোদনা কর্মসূচির মাধ্যমে বাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়ানো এবং উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করে থাকে।

ঘোষিত প্যাকেজ অনুযায়ী, মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায়। এছাড়া সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে, যার ফলে উদ্যোক্তারা কার্যত ৭ শতাংশ সুদে ঋণ গ্রহণের সুযোগ পাবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষিভিত্তিক কার্যক্রম এবং রপ্তানি খাতকে সক্রিয় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তহবিলের সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত পুনরায় চালুর জন্য। এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন ব্যয় মেটানো, শ্রমিকদের বেতন প্রদান এবং রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহার করা যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এই খাত থেকেই প্রায় দুই লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

এছাড়া ক্ষুদ্র, কুটির, মাঝারি ও মাইক্রো শিল্প বা সিএমএসএমই খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, এই খাতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং স্থানীয় শিল্পকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যেও এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ কৃষিভিত্তিক উৎপাদন, গ্রামীণ উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রমে সহায়তা দেবে বলে জানানো হয়েছে। এ খাত থেকে প্রায় ৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং দেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প হাব গড়ে তুলতেও আলাদাভাবে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চলে শিল্পভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানো এবং বিকল্প রপ্তানি পণ্য উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে বিভিন্ন অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, চামড়া ও জুতা শিল্প, মৎস্য রপ্তানি, প্রবাসী কর্মসংস্থান, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, পরিবেশবান্ধব গ্রিন প্রকল্প, স্টার্টআপ এবং সৃজনশীল অর্থনীতি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই প্রণোদনা কর্মসূচির ফলে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়বে, বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নতুন গতি সৃষ্টির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।