জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

ভুল মৃত্যুসংবাদে নাতনির আগেই চলে গেলেন দাদি

নাতনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে—এমন ভুল খবর শুনে তীব্র মানসিক আঘাতে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন ৯০ বছর বয়সী খাইরুন নেছা। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, যে নাতনির মৃত্যুসংবাদ শুনে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন, কিছুক্ষণ পর সেই জান্নাতুল ফাহিমকেই জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় খুঁজে পান স্বজনেরা। কিন্তু সেই স্বস্তির খবর দাদির কাছে পৌঁছানোর আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক পরিণতি।

রোববার (১৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের উত্তর আলামপুর গ্রামের সুতা ব্যাপারী বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। খাইরুন নেছা ওই বাড়ির বদিউর রহমানের স্ত্রী। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের আবহ নেমে এসেছে।

পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেলে উপজেলার সিলোনীয়া বাজার এলাকায় একটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে সিলোনীয়া উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রী নিহত হয়। দুর্ঘটনার পর একই বিদ্যালয়ের আরেক ছাত্রী জান্নাতুল ফাহিমকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। জান্নাতুল ফাহিম খাইরুন নেছার নাতনি হওয়ায় স্বজনদের মধ্যে দ্রুত উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

দুর্ঘটনায় একজন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার খবর এবং নাতনিকে খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টি একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি করে। নিশ্চিতভাবে পরিচয় যাচাইয়ের আগেই তাঁদের মধ্যে ধারণা জন্ম নেয়, দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থীটি হয়তো জান্নাতুল ফাহিম। সেই ধারণা থেকেই নাতনির মৃত্যুর খবর পরিবারের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

নাতনির মৃত্যুসংবাদ শোনার পর খাইরুন নেছা প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পান। স্বজনদের ভাষ্য, তিনি অচেতন হয়ে ঘরের ভেতর লুটিয়ে পড়েন। তখনও পরিবারের সদস্যদের কাছে জান্নাতুল ফাহিমের প্রকৃত অবস্থান নিশ্চিত ছিল না।

অন্যদিকে, স্বজনেরা জান্নাতুলকে খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে তাঁকে সুস্থ ও অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। অর্থাৎ, যে মৃত্যুসংবাদকে কেন্দ্র করে পরিবারে শোক নেমে এসেছিল, সেটি ছিল ভুল। স্বজনেরা নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির দিকে ফেরার সময় জানতে পারেন, খাইরুন নেছা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

তাঁকে দ্রুত দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে চিকিৎসক জানিয়েছেন।

খাইরুন নেছার ছেলে স্বপন মিয়া জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনি সিলোনীয়া বাজারে ছুটে যান এবং সেখানে নিজের মেয়েকে খুঁজতে থাকেন। দীর্ঘ সময় মেয়েকে না পেয়ে তিনি বিষয়টি বাড়িতে জানান। এ সময় তাঁর মা নাতনির মৃত্যুর খবর শুনে প্রচণ্ড শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে মেয়েকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া গেলেও মাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. ইফরাদ খন্দকার জানান, ওই বৃদ্ধাকে হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর ধারণা, তীব্র মানসিক আঘাতের পর নিজ বাড়িতেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারেন।

ঘটনাটি পরিবারটির জন্য একই সঙ্গে স্বস্তি ও শোকের এক অসহনীয় অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে নাতনি জীবিত—এই খবর পরিবারকে স্বস্তি দেওয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে, সেই খবরটি দাদির কাছে পৌঁছানোর আগেই তাঁকে হারাতে হয়েছে স্বজনদের।

এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দুর্ঘটনা কিংবা নিখোঁজের মতো সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে পরিচয় নিশ্চিত না করে মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে দেওয়া কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। একটি ভুল ধারণা মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিবারের ওপর চরম মানসিক চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে আকস্মিক শোক বা ভয় শারীরিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।

তাই কোনো দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার আগে অনুমাননির্ভর তথ্য ছড়িয়ে না দেওয়া জরুরি। স্বজনদের ক্ষেত্রেও আতঙ্কের মুহূর্তে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ একটি ভুল খবর কখনো কখনো শুধু বিভ্রান্তিই তৈরি করে না—তার পরিণতি হয়ে উঠতে পারে অপূরণীয়।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর