পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ও ঢালু সড়কে আবারও ঝরে গেল তাজা প্রাণ। রাঙামাটি সদর উপজেলার সাপছড়ি ইউনিয়নের চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কে একটি যাত্রীবাহী পুরোনো পিকআপ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের ওপর উল্টে যাওয়ার মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই তিন জন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও এক জনসহ মোট চার জনের মৃত্যু হয়েছে। এই দুর্ঘটনায় পিকআপচালকসহ আরও দুই জন গুরুতর আহত হয়েছেন, যাঁদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। সাপ্তাহিক হাটে সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়া সাধারণ কিছু মানুষের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন রোববার সকালে রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে একটি পুরোনো ও যান্ত্রিকভাবে দুর্বল পিকআপে করে বেশ কয়েকজন যাত্রী কুতুকছড়ি বাজারের দিকে রওনা হয়েছিলেন। দিনটি ছিল সাপ্তাহিক হাটের দিন, ফলে সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় কৃষকদের ভিড় ছিল বেশ। উদ্দেশ্য ছিল বাজার থেকে কাঁচা সবজি, তরকারি এবং প্রয়োজনীয় সদাইপত্র সংগ্রহ করা। কিন্তু পাহাড়ি পথের দুর্গমতা এবং গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় আনন্দের সেই যাত্রা মুহূর্তেই বিষাদে রূপ নেয়।
দুর্ঘটনাটি ঘটে মানিকছড়ি আর্মিক্যাম্পের ঠিক সামনে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, গাড়িটি যখন পাহাড়ি ওই ঢাল ও বাঁক পার হচ্ছিল, তখন হঠাৎ করেই চালক পিকআপটির ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। চোখের পলকে গাড়িটি সড়কের ওপর উল্টে গিয়ে একদম দুমড়েমুচড়ে যায়। পিকআপের বডিতে থাকা যাত্রীরা ছিটকে পড়েন এবং অনেকে গাড়িটির নিচে চাপা পড়েন। আশপাশের মানুষেরা আকস্মিক বিকট শব্দ শুনে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং নিজেদের উদ্যোগে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে পুলিশও খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহায়তায় হতাহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিন জন। মারাত্মক আহত অবস্থায় বাকিদের দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু পথেই আরও এক জনের মৃত্যু হয়। নিহত চার জনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। তাঁরা হলেন—মেঘরানী চাকমা (৪৫), শান্তনা চাকমা (৩৮), শান্তি রঞ্জন চাকমা (৬৫) এবং শোভা চাকমা (৫২)। অন্যদিকে, গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন পিকআপচালক জ্ঞান বিকাশ চাকমা (৫০) এবং অপর যাত্রী সুমন চাকমা (৪৫)। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আহতদের দুজনের অবস্থাই অত্যন্ত সংকটাপন্ন।
খবর পেয়ে রাঙামাটি কোতোয়ালি থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং দুর্ঘটনাকবলিত পিকআপটি জব্দ করে। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত চার জনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে পরিবারের কাছে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হবে। কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই মর্মান্তিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত আইনি প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ঠিক কী কারণে চালক গাড়িটির ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন, তা যান্ত্রিক ত্রুটি নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে—তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পাহাড়ি অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে পিকআপ ও লোকাল থ্রি-হুইলারের মতো যানবাহন। বিশেষ করে রাঙামাটির সড়কগুলো অত্যন্ত সরু, খাড়া ঢাল এবং অন্ধ বাঁকে ভরপুর। এ ধরনের বিপজ্জনক সড়কে ফিটনেসবিহীন পুরোনো যানবাহন চলাচলের কারণে প্রায়ই এ ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পাহাড়ি সড়কে চলাচলের উপযোগী নয় এমন যানবাহন যাত্রীবাহী হিসেবে ব্যবহার বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অন্যথায় সাধারণ মানুষের এমন অপমৃত্যু রোধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। প্রিয়জনদের হারিয়ে শোকে স্তব্ধ স্বজনেরা এখন শুধু সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছেন।









