জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

কাওয়ালির সম্রাট নুসরাত ফতেহ আলী খানের অমর উত্তরাধিকার

কণ্ঠে ছিল প্রার্থনার আকুলতা, সুরে ছিল আত্মার গভীর আর্তি। তাঁর কাওয়ালি শুনলে মনে হতো, সংগীত যেন ধীরে ধীরে পার্থিব জগতের সীমানা পেরিয়ে এক আধ্যাত্মিক অনুভূতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। শক্তিশালী কণ্ঠ, অসাধারণ স্বরনিয়ন্ত্রণ, তাৎক্ষণিক সুরসৃষ্টি এবং আবেগঘন পরিবেশনার অনন্য ক্ষমতা দিয়ে তিনি শুধু কাওয়ালির শ্রোতাদের মুগ্ধ করেননি; বিশ্বসংগীতের বিশাল পরিসরেও নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন এক স্থায়ী আসন।

তিনি উস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খান—কাওয়ালির কিংবদন্তি, সুফি সংগীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী এবং দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়া এক অসাধারণ শিল্পী। তাঁর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরও তাঁর কণ্ঠ, পরিবেশনা ও সৃষ্টিশীলতার প্রভাব নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

ছয় শতকের সংগীত-ঐতিহ্যের উত্তরসূরি

নুসরাত ফতেহ আলী খান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৮ সালের ১৩ অক্টোবর তৎকালীন লায়ালপুরে, যা বর্তমানে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ নামে পরিচিত। তিনি এমন একটি পরিবারে জন্মেছিলেন, যার কাওয়ালি পরিবেশনের ঐতিহ্য প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে চলে আসছিল। তাঁর বাবা উস্তাদ ফতেহ আলী খান ছিলেন কাওয়ালি ও শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশিষ্ট শিল্পী এবং তাঁর প্রথমদিকের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক।

শৈশব থেকেই সংগীতের পরিবেশে বেড়ে উঠলেও নুসরাতের বাবা শুরুতে চেয়েছিলেন, ছেলে যেন সংগীতের বদলে চিকিৎসা পেশায় যায়। কিন্তু সংগীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এতটাই প্রবল ছিল যে শেষ পর্যন্ত পারিবারিক ঐতিহ্যই তাঁর জীবনের পথ হয়ে ওঠে।

১৯৬৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর কিশোর নুসরাত পারিবারিক কাওয়ালি দলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে চাচা ও অন্যান্য প্রবীণ শিল্পীর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি নিজের সংগীতভাষা তৈরি করতে শুরু করেন। ১৯৭১ সালের দিকে তিনি পারিবারিক কাওয়ালি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনার সঙ্গে নিজের সৃষ্টিশীলতা যুক্ত করেন।

ঐতিহ্যের ভেতরেই তৈরি করেছিলেন নতুন ভাষা

কাওয়ালি মূলত সুফি ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত এক ধরনের ভক্তিমূলক সংগীত। কবিতা, সুর, তালি, সমবেত কণ্ঠ, তালের পুনরাবৃত্তি এবং ক্রমবর্ধমান আবেগ—সব মিলিয়ে এর পরিবেশনা ধীরে ধীরে শ্রোতাকে এক বিশেষ আবহের মধ্যে নিয়ে যায়।

নুসরাত এই ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ন রেখেই পরিবেশনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন। তাঁর আলাপ, তান, সরগম, দ্রুত স্বরবিন্যাস এবং দীর্ঘ সময় ধরে কণ্ঠের তীব্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা ছিল বিস্ময়কর। একটি কাওয়ালি তাঁর কণ্ঠে শুরু হতো তুলনামূলক সংযতভাবে, পরে ধীরে ধীরে তীব্রতা বাড়ত এবং শেষ পর্যায়ে তা পরিণত হতো এক আবেগময় সংগীত-অভিজ্ঞতায়।

এই পরিবেশনাশৈলীই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়। তাঁর কণ্ঠে কখনো ছিল স্রষ্টার প্রতি নিবেদন, কখনো সুফি কবিতার প্রেমময় আবেদন, আবার কখনো মানবিক আবেগের তীব্র প্রকাশ। ফলে ভাষা পুরোপুরি না বুঝলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রোতারা তাঁর সংগীতের আবেগ উপলব্ধি করতে পারতেন।

কাওয়ালিকে নিয়ে গেলেন বিশ্বমঞ্চে

নুসরাতের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি ছিল কাওয়ালিকে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ১৯৮৫ সালে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত বিশ্বসংগীত, শিল্প ও নৃত্যের উৎসবে তাঁর পরিবেশনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এর পর থেকেই ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর পরিচিতি দ্রুত বাড়তে থাকে।

পিটার গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে তাঁর সহযোগিতা এই আন্তর্জাতিক যাত্রাকে আরও বিস্তৃত করে। বিশ্বসংগীতের শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার সময় নুসরাত ঐতিহ্যবাহী কাওয়ালির মূল চরিত্র ধরে রেখেও নতুন ধরনের সংগীত-পরীক্ষায় অংশ নেন। পিটার গ্যাব্রিয়েল পরে নুসরাতের সঙ্গে কাজের স্মৃতিচারণ করে তাঁর তাৎক্ষণিক সুরসৃষ্টি, সময়জ্ঞান ও সংগীতের গঠন সম্পর্কে অসাধারণ দক্ষতার প্রশংসা করেছিলেন।

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তাঁর পরিবেশনা কাওয়ালিকে আরও বিস্তৃত শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেয়। ১৯৮৭ সালে তিনি জাপানেও সংগীত পরিবেশন করেন এবং সেখানে তাঁর সংগীতের প্রতি উল্লেখযোগ্য আগ্রহ তৈরি হয়।

সম্মাননা ও স্বীকৃতি

নিজ দেশের সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য পাকিস্তান সরকার ১৯৮৭ সালে তাঁকে ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ পুরস্কারে সম্মানিত করে। ১৯৯৫ সালে তিনি লাভ করেন ইউনেসকো সংগীত পুরস্কার। ১৯৯৬ সালে মন্ট্রিয়ল বিশ্ব চলচ্চিত্র উৎসবে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ‘গ্রাঁ প্রি দে জ্যামেরিক’ সম্মান পান এবং একই বছর ফুকুওকা এশিয়ান কালচার প্রাইজের শিল্প ও সংস্কৃতি পুরস্কারেও ভূষিত হন।

তাঁর সংগীতের বিস্তার শুধু কাওয়ালির আসরে সীমাবদ্ধ ছিল না। চলচ্চিত্রের সংগীত, বিশ্বসংগীতের বিভিন্ন প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক শিল্পীদের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী সংগীতকে সমকালীন শ্রোতাদের কাছেও পরিচিত করে তুলেছিলেন।

জনপ্রিয়তা ছাড়িয়ে তৈরি হয়েছিল সাংস্কৃতিক প্রভাব

‘আফরিন আফরিন’, ‘তুমে দিল্লাগি’, ‘আল্লাহু’, ‘ইয়ে জো হালকা হালকা সুরুর হ্যায়’, ‘আখিয়ান উডিক দিয়ান’সহ তাঁর অসংখ্য পরিবেশনা আজও শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়। তাঁর গাওয়া সুফি কবিতা ও কাওয়ালির অনেক অংশ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শিল্পী নতুনভাবে পরিবেশন করেছেন।

তাঁর প্রভাব কেবল পাকিস্তান বা ভারতীয় উপমহাদেশে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পশ্চিমা সংগীতশিল্পীদের একটি অংশ তাঁর কণ্ঠ ও তাৎক্ষণিক সুরসৃষ্টির ক্ষমতা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। জেফ বাকলি থেকে শুরু করে বিশ্বসংগীতের নানা ধারার শিল্পীদের ওপর তাঁর সংগীতের প্রভাব নিয়ে পরবর্তী সময়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। তাঁর সংগীতকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন প্রজন্মের শ্রোতা ও গবেষকদের আগ্রহও।

তাঁর বিপুল রেকর্ডিং-ঐতিহ্যও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জীবদ্দশায় তিনি বিপুলসংখ্যক কাওয়ালি রেকর্ড করেন এবং পরবর্তীতে তাঁর নাম কাওয়ালি শিল্পীদের সর্বাধিক রেকর্ডিংয়ের সঙ্গে যুক্ত বিশ্বরেকর্ডের তালিকায় স্থান পায়।

মাত্র ৪৮ বছরেই থেমে গেল জীবন

দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর জীবন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। ১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪৮ বছর বয়সে নুসরাত ফতেহ আলী খানের মৃত্যু হয়। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ বিশ্বসংগীত অঙ্গনে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছিল।

কিন্তু তাঁর মৃত্যু সংগীতকে থামাতে পারেনি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, তাঁর কণ্ঠের আবেদন ততই নতুন শ্রোতাদের কাছে পৌঁছেছে। তাঁর ভাতিজা রহাত ফতেহ আলী খানসহ পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীরা পারিবারিক সংগীত-ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।

আজ ২০২৬ সালের ১৬ আগস্ট তাঁর ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। প্রায় তিন দশক আগে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া সেই শিল্পীর কণ্ঠ এখনো কাওয়ালির আসর, সংগীতের সংকলন এবং নতুন প্রজন্মের শ্রোতার কানে ফিরে আসে।

নুসরাত ফতেহ আলী খান শুধু একজন কাওয়াল ছিলেন না। তিনি ছিলেন কয়েক শতাব্দীর একটি সংগীত-ঐতিহ্যের শক্তিশালী উত্তরসূরি, যিনি সেই ঐতিহ্যকে নিজের প্রতিভায় নতুন রূপ দিয়েছিলেন। দরগাহ ও মেহফিলের পরিসর পেরিয়ে কাওয়ালিকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক সংগীতের বড় মঞ্চে।

তাঁর কণ্ঠে সুফি কবিতা হয়ে উঠেছিল অনুভূতির সার্বজনীন ভাষা। তাই তাঁর প্রয়াণের ২৯ বছর পরও নুসরাত ফতেহ আলী খানকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন প্রয়াত শিল্পীকে স্মরণ করা নয়; বরং এমন এক সংগীত-দর্শনকে স্মরণ করা, যেখানে সুরের সঙ্গে মানুষের আত্মিক অনুভূতির গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়।

কণ্ঠ থেমে গেছে, মানুষটি নেই। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি এখনো বেজে চলে। আর সেই কারণেই কাওয়ালির ইতিহাসে নুসরাত ফতেহ আলী খানের নাম শুধু একটি অধ্যায় নয়—একটি দীর্ঘস্থায়ী যুগের পরিচয়।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর