চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় আবারও ফিরে এসেছে রাজনৈতিক সহিংসতার বীভৎস রূপ। সোমবার রাতের অন্ধকারে পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের সিকদার পাড়া গ্রামে মোটরসাইকেল আরোহী ঘাতকদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন জানে আলম সিকদার (৪৮) নামের এক প্রভাবশালী যুবদল নেতা। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের অতি সন্নিকটে সংঘটিত হওয়ায় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবার এবং দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে এখন শোকের মাতম চলছে।
নিহত জানে আলম সিকদার কেবল রাউজান উপজেলা যুবদলের সদস্যই ছিলেন না, তিনি পূর্বে ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তিনি বিএনপির প্রভাবশালী নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনামতে, সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে জানে আলম স্থানীয় অলিমিয়াহাট বাজার থেকে নিজ বাসভবনের দিকে ফিরছিলেন। বাড়ির কাছাকাছি একটি নির্জন স্থানে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মোটরসাইকেলে থাকা তিন মুখোশধারী দুর্বৃত্ত তাঁকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। জানে আলমের বুকে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে একাধিক গুলিবিদ্ধ হলে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং ঘাতকরা দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।
নিচে রাউজান এলাকার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতা ও এই হত্যাকাণ্ডের সারসংক্ষেপ একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
রাউজান উপজেলার সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও নিহতের তথ্য
| বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| নিহতের নাম ও পদবি | মুহাম্মদ জানে আলম সিকদার (সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ইউনিয়ন যুবদল) |
| রাজনৈতিক আনুগত্য | গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বলয় (বিএনপি) |
| হত্যাকাণ্ডের মাধ্যম | মোটরসাইকেলে আসা মুখোশধারী ৩ জন ঘাতক |
| ৫ আগস্ট পরবর্তী মোট হত্যা | ১৭টি (রাজনৈতিক কারণে ১২টি) |
| অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মৃত্যু | ১০ জন (বিএনপি সমর্থিত) |
| মোট রাজনৈতিক সংঘর্ষ | ১০০ বারের বেশি |
| গুলিবিদ্ধ আহতের সংখ্যা | ৩৫০ জনের অধিক |
এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গুলিবিদ্ধ জানে আলমকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফিরোজ আহমদ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, জানে আলম একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা ছিলেন এবং এই হত্যার নেপথ্যে থাকা অপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। রাউজানের সাম্প্রতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে এখানে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অসংখ্য প্রাণহানি ঘটেছে। বিশেষ করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ গ্রুপগুলোর মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা এলাকাটিকে একটি আতঙ্কের জনপদে পরিণত করেছে।
পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক দিপ্তেষ দাশ জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে কাজ শুরু করেছে। মোটরসাইকেল আরোহী সেই তিন ঘাতককে খুঁজে বের করতে পুলিশের একাধিক দল বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে। নিহতের মরদেহ বর্তমানে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। রাউজানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
