ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সাহসী যোদ্ধাদের আইনি নিরাপত্তা ও সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি বিশেষ অধ্যাদেশ প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকা বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পুলিশি গ্রেপ্তারের শিকার হওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার এই দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে জুলাই বিপ্লবীদের বীরত্বপূর্ণ অবদানকে আইনি ঢালের মাধ্যমে সুরক্ষিত করতে আইন মন্ত্রণালয়কে খসড়া প্রস্তুত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ ডিসেম্বর তাহরিমা জান্নাত সুরভী এবং ৩ জানুয়ারি হবিগঞ্জের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসানকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় সরকার বিব্রতবোধ করছে। যদিও তারা পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে জামিন পেয়েছেন, তবে এ ধরনের হয়রানি বন্ধে একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা থাকা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। সরকার এই দায়মুক্তির ভিত্তি হিসেবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক উদাহরণটি পর্যালোচনা করছে। মূলত, যারা জীবন বাজি রেখে দেশকে একটি জবরদস্তিমূলক ও অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্ত করেছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ।
নিচে জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের মূল কাঠামো সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:
জুলাই বিপ্লবীদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা প্রকল্পের সারসংক্ষেপ
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত তথ্যাবলি ও গুরুত্ব |
| অধ্যাদেশের আওতাধীন সময় | ১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত সংঘটিত সকল কর্মকাণ্ড |
| আইনি ভিত্তি | সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ ও ঐতিহাসিক দায়মুক্তি আইনসমূহ |
| প্রধান উদ্দেশ্য | হয়রানিমূলক মামলা ও গ্রেপ্তার থেকে স্থায়ী আইনি সুরক্ষা |
| আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট | আরব বসন্ত ও সমসাময়িক বিপ্লব-পরবর্তী বৈশ্বিক মডেল পর্যালোচনা |
| আন্দোলনের চাহিদা | বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্থাপিত ৩ দফা দাবির প্রতিফলন |
| মামলার অগ্রগতি | শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার চার্জশিট (৭ জানুয়ারি) |
| পরবর্তী প্রক্রিয়া | উপদেষ্টামণ্ডলীর বৈঠকে খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন ও জারি |
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এ প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অকুতোভয় সৈনিকেরা দেশকে একটি জবরদস্তিমূলক ও গণধিকৃত শাসন থেকে স্বাধীন করেছেন। তারা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়মুক্তির দাবি রাখেন। তিনি আরও জানান, আরব বসন্ত বা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী যেসব দেশে দায়মুক্তি আইন হয়েছে, সেই সব অভিজ্ঞতাও খসড়া তৈরির ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হবে। এর আগে গত বছরের ১৪ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিবৃতি দিয়ে আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার না করার নির্দেশনা দেওয়া হলেও, এই নতুন অধ্যাদেশটি সেই সুরক্ষা ব্যবস্থাকে একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী রূপ দেবে।
একই সভায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে প্রশাসনের জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, দাবি আদায়ের নামে সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ছাড় দেবে না এবং তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এছাড়া সভায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি, সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতির মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। জুলাইয়ের সম্মুখসারির বীর শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার অংশ হিসেবে আগামী ৭ জানুয়ারি চার্জশিট প্রদানের ঘোষণা সরকারের বিচার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাকেই প্রমাণ করে।
