রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসিকে থামানোর পরিকল্পনা করতে হয়েছে হোসে মরিনিওকে বহুবার। স্প্যানিশ ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত দ্বৈরথগুলোর একটিতে মেসির বিপক্ষে কৌশল সাজানো ছিল পর্তুগিজ কোচের জন্য নিয়মিত চ্যালেঞ্জ। সময়ের সঙ্গে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেরিয়ে এখন মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তে প্রকাশ্যে শ্রদ্ধা ও আক্ষেপ জানিয়েছেন মরিনিও।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মেসির বিদায়ের ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তার বার্তায় প্রতিক্রিয়া জানান মরিনিও। তিনি মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে অসাধারণ ও স্মরণীয় হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, মেসি না থাকলে পরবর্তী কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ আর আগের মতো থাকবে না।
মেসি গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত জানান। নিজের বিদায়বার্তায় আর্জেন্টাইন অধিনায়ক বলেন, দীর্ঘ সময় চিন্তাভাবনার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিদ্ধান্তটি নেওয়া তার জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল বলেও জানান তিনি।
মেসির বিদায়বার্তায় উঠে আসে জাতীয় দলের জার্সির প্রতি তার দীর্ঘদিনের দায়বদ্ধতার কথাও। তিনি জানান, শুধু সাম্প্রতিক সময়ে সাফল্য পাওয়ার পর নয়, এর আগের কঠিন সময়গুলোতেও তিনি দেশের হয়ে সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। দলের হয়ে লড়াই করা, সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানো এবং আর্জেন্টাইন হিসেবে গর্ব অনুভব করানোর লক্ষ্যেই তিনি মাঠে নামতেন বলে জানান আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাফল্যের মিশেলে গড়া। শুরুর দিকে একাধিক বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে ব্যর্থতার কারণে তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। পরে সেই হতাশার অধ্যায় পেরিয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায় তৈরি করেন তিনি।
মেসির এই পথচলায় ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে জয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার জার্সিতে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা পান তিনি। পরের বছর কাতারে বিশ্বকাপ জিতে সেই সাফল্য আরও পূর্ণতা পায়। বিশ্বকাপে মেসির নেতৃত্ব ও পারফরম্যান্স আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
এরপরও জাতীয় দলের হয়ে মেসির উপস্থিতি ছিল আর্জেন্টিনার ফুটবলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। তার নেতৃত্ব, গোল করার ক্ষমতা, বল নিয়ন্ত্রণ এবং সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার দক্ষতা তাকে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মরিনিওর সঙ্গে মেসির সম্পর্কের ইতিহাস অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের। রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় মরিনিওকে বার্সেলোনার মেসিকে সামলাতে হয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে। সে সময় রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু স্পেনের ফুটবলেই নয়, গোটা বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ফুটবল দ্বৈরথে পরিণত হয়েছিল।
সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় মেসিকে আটকানোর জন্য রিয়ালের কৌশলে বিশেষ গুরুত্ব পেত তার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা এবং আক্রমণভাগে তার প্রভাব কমিয়ে দেওয়া। মাঠের লড়াইয়ে দুজনের অবস্থান ছিল বিপরীত শিবিরে। কিন্তু মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে এসে সেই পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন জায়গা করে দিয়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে।
মেসির বিদায়বার্তার নিচে মরিনিও যে মন্তব্য করেছেন, তাতে সেই শ্রদ্ধাই স্পষ্ট। তিনি মেসিকে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে পরবর্তী কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ টেনেছেন। তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল—মেসির মতো একজন তারকা না থাকলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরগুলোর আকর্ষণ ও অভিজ্ঞতায় বড় পরিবর্তন আসবে।
মেসির সিদ্ধান্ত তাই শুধু আর্জেন্টিনা দলের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলের জন্যও একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং আর্জেন্টিনার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের সঙ্গে তার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। এখন সেই পরিচিত দৃশ্যের অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
একসময় যিনি মেসির বিপক্ষে কৌশল সাজিয়েছেন, সেই মরিনিওর বিদায়ী শ্রদ্ধাবার্তাই যেন সেই দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরেকটি অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে দিল।









