মেসির পর নেইমারই সেরা, ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে ফেভারিট মানছেন জাভি

স্প্যানিশ ফুটবলের প্রবাদপ্রতিম মিডফিল্ডার এবং বার্সেলোনার সাবেক সফল কোচ জাভি হার্নান্দেজ ফুটবল বিশ্বে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন। সম্প্রতি ব্রাজিলের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোমারিও’র ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জাভি তাঁর সাবেক সতীর্থ নেইমার জুনিয়রের অসামান্য প্রতিভা এবং ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন। বার্সেলোনায় নেইমারের শুরুর দিনগুলো থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের ফুটবলীয় সমীকরণ—সবকিছুই উঠে এসেছে এই বিশদ আলোচনায়।

বার্সেলোনা স্মৃতি ও নেইমারের প্রতিভা বিশ্লেষণ

জাভি হার্নান্দেজ ও নেইমার জুনিয়র বার্সেলোনায় ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মাত্র দুই মৌসুম একসাথে মাঠ মাতিয়েছেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়েই তাঁরা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, স্প্যানিশ লা লিগা, কোপা ডেল রে এবং স্প্যানিশ সুপার কাপসহ সম্ভাব্য সব বড় শিরোপা জয় করেন। জাভির মতে, সেই সময়ে নেইমার যা প্রদর্শন করেছিলেন, তা ছিল অভাবনীয়।

সাক্ষাৎকারে জাভি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “বার্সেলোনায় প্রথম সপ্তাহে নেইমারকে দেখার পর আমার মনে হয়েছিল—লিওনেল মেসির সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়ার ক্ষমতা যদি কারো থাকে, তবে সেটি নেইমারের। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি যখন ন্যু ক্যাম্পে যোগ দেন, তখন মেসির বিকল্প হিসেবে তাঁর চেয়ে যোগ্য আর কাউকে আমার চোখে পড়েনি।” জাভি আরও যোগ করেন যে, সেই সময় মাঠে জাভি নিজে খেলার গতি ও ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতেন, আর নেইমার ছিলেন সেই শিল্পী যিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ছিন্নভিন্ন করে গোলমুখে হানা দিতেন। মেসি, সুয়ারেজ ও নেইমারকে নিয়ে গঠিত সেই ‘এমএসএন’ ত্রয়ী আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিধ্বংসী আক্রমণভাগ হিসেবে বিবেচিত।


নেইমারকে ফেরানোর উদ্যোগ ও বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা

কোচ হিসেবে বার্সেলোনার দায়িত্ব পালনকালেও জাভি চেয়েছিলেন নেইমারকে পুনরায় কাতালান ক্লাবটিতে ফিরিয়ে আনতে। জাভি জানান, নেইমারের ফুটবলীয় সামর্থ্য নিয়ে তাঁর মনে কোনো দ্বিধা ছিল না, কিন্তু ক্লাবের তৎকালীন নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ‘ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে’ আইনের জটিলতার কারণে সেই দলবদল আর আলোর মুখ দেখেনি।

বর্তমানে নেইমার ব্রাজিলের ক্লাব সান্তোসে খেলছেন এবং জাতীয় দলে নিজের স্থান পুনরুদ্ধারে লড়ছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে খেলা নেইমারের জন্য এখন বড় লক্ষ্য। তবে ইনজুরি বা চোট তাঁর এই যাত্রায় বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোটের কারণে তিনি মার্চ মাসে ক্রোয়েশিয়া ও ফ্রান্সের বিপক্ষে ব্রাজিলের প্রীতি ম্যাচে স্কোয়াডে থাকতে পারেননি। দ্রুত ফিটনেস ফিরে পেতে তিনি ‘প্লাটিলেট-রিচ প্লাজমা’ (PRP) থেরাপিও গ্রহণ করেছেন। আজ ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখ আর্জেন্টিনায় সান লোরেঞ্জোর বিপক্ষে কোপা সুদামেরিকানা ম্যাচে তাঁর মাঠে ফেরার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এখন ফুটবল ভক্তদের অপেক্ষা ১৮ মে’র দিকে, যেদিন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা করা হবে এবং সেখানে নেইমারের নাম অন্তর্ভুক্ত হয় কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।


২০২৬ বিশ্বকাপ: ফেভারিট তালিকায় ব্রাজিল ও অন্য দেশসমূহ

আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। এই বিশ্ব আসর নিয়ে জাভি হার্নান্দেজ ব্রাজিলকে প্রধান ফেভারিট হিসেবে দেখছেন। তাঁর এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে দুটি প্রধান যুক্তি রয়েছে: ১. কার্লো আনচেলত্তির জাদুকরী নেতৃত্ব: জাভির মতে, আনচেলত্তি এমন একজন কোচ যিনি ফুটবলারদের ভেতর থেকে সেরাটা বের করে আনতে পারদর্শী। ২. ব্রাজিলের ঐতিহ্যগত শক্তি: বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিল সব সময়ই একটি পাওয়ার হাউস এবং যেকোনো দলকে হারানোর সামর্থ্য রাখে।

ব্রাজিল ছাড়াও জাভির সম্ভাব্য বিজয়ীর তালিকায় রয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্স এবং পর্তুগাল। ইংল্যান্ডকেও তিনি এবারের আসরে বড় চমক হিসেবে দেখছেন। তবে তাঁর দৃষ্টিতে জার্মানি বর্তমানে তাদের আগের সেই দাপুটে অবস্থানে নেই। নিজ দেশ স্পেন নিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “স্পেন এমন একটি দেশ যেখানে ফুটবল কেবল খেলা নয়, বরং শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। আমাদের জার্সিতে দ্বিতীয় শিরোপার তারকাটি যুক্ত হলে তা হবে দারুণ এক অর্জন।”


ব্রাজিল কোচ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সাক্ষাৎকারে জাভি হার্নান্দেজকে যখন প্রশ্ন করা হয় তিনি ভবিষ্যতে ব্রাজিলের কোচ হতে আগ্রহী কি না, তখন তিনি অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দেন। জাভি বলেন, “কেন নয়? আমি ক্লাব হোক বা জাতীয় দল—যেকোনো বড় প্রকল্পের দায়িত্ব নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ব্রাজিল হলো ফুটবলের আঁতুড়ঘর। সেখানে কাজ করার এবং বড় কোনো শিরোপা জেতার সুযোগ থাকলে আমি অবশ্যই আগ্রহী হব।”

জাভির এই সাক্ষাৎকারটি কেবল স্মৃতিচারণ নয়, বরং আধুনিক ফুটবলের কৌশলগত দিক এবং আগামীর সম্ভাবনা নিয়ে এক গভীর বিশ্লেষণ। নেইমারের ফিটনেস এবং ২০২৬ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড নিয়ে ফুটবল বিশ্বে যে অস্থিরতা ও উত্তেজনা বিরাজ করছে, জাভির এই বক্তব্য তাতে নতুন মাত্রা যোগ করল। ১৮ মে তারিখেই নির্ধারিত হবে নেইমারের বিশ্বকাপ স্বপ্ন পূরণ হবে কি না।


২০২৬ বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি:

  • আয়োজক দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা।

  • সময়কাল: ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই, ২০২৬।

  • ব্রাজিলের কোচ: কার্লো আনচেলত্তি।

  • নেইমারের সম্ভাব্য ফেরার ম্যাচ: ২৮ এপ্রিল (সান লোরেঞ্জোর বিপক্ষে)।

  • স্কোয়াড ঘোষণার তারিখ: ১৮ মে, ২০২৬।