শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন আবাসিক ও অনাবাসিক মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়ন ও বলাৎকারের ঘটনাগুলো নিয়মিত শিরোনাম হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দেশে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনাগুলোর পৃথক প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিসংখ্যান সংরক্ষিত না হলেও, তাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ বলছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক অপরাধের একটি বড় অংশ ঘটছে মাদ্রাসাগুলোতে।
Table of Contents
সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত অপরাধের চিত্র
অনিয়ম ও যৌন নিপীড়নের ঘটনাগুলোর ধরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষকরা ভয়ভীতি ও ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে শিশুদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছেন:
কুষ্টিয়ার কুমারখালী: শিশুশিক্ষার্থীকে বলাৎকার করে ‘স্বপ্ন দেখার’ কথা বলে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন মোস্তাফিজুর রহমান নামের এক শিক্ষক। পরবর্তীতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের আপস-সালিশি প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে ভুক্তভোগীর পরিবার আইনের শরণাপন্ন হলে পুলিশ অভিযুক্তকে আটক করে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী: একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রধান শিক্ষক রমিজ উদ্দীনের বিরুদ্ধে ৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীকে দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে বলাৎকারের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
নেত্রকোনার ঘটনা: আমানুল্লা মাহমুদী নামের এক শিক্ষকের ধর্ষণের শিকার হয়ে ১১ বছর বয়সী এক শিশুশিক্ষার্থী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। পরে পুলিশ অভিযুক্তকে রিমান্ডে নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে।
গাজীপুরের শ্রীপুর: শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার সময় স্থানীয় জনতার হাতে ধরা পড়েন শিক্ষক আবদুল মালেক। পরবর্তীতে তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করলে তাঁকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
নারায়ণগঞ্জ ও নেত্রকোনা (আগের ঘটনা): নারায়ণগঞ্জে পরকালের ভয় ও তাবিজে ক্ষতি করার কথা বলে ১১ জন শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে র্যাব। অন্যদিকে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় কোরআন ছুঁইয়ে শপথ করিয়ে নির্যাতনের তথ্য গোপনের চেষ্টার অভিযোগ গণপিটুনির শিকার হন এক অধ্যক্ষ।
ধর্ষণের সামগ্রিক তথ্য ও পরিসংখ্যান
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS) ও আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে শিশু ও নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে:
| সংস্থা/প্রতিবেদন | সময়কাল | মোট ধর্ষণের ঘটনা | শিশু ও কিশোরী ভুক্তভোগী | ধর্ষণের পর হত্যা |
| হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS) | জানুয়ারি – জুন | ৪০৪টি | ২৩৮ জন | ১৭ জন |
| হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS) | জুলাই (একক মাস) | ৯৫টি | ৬১ জন (১৮ বছরের কম) | – (গণধর্ষণ: ১১ জন) |
| আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) | জানুয়ারি – জুন | ৩১৯টি | ১৬৪ জন (অপ্রাপ্তবয়স্ক) | ৩০ জন |
| আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) | বিগত পূর্ণাঙ্গ বছর | ৭৫৯টি | ৩৭০ জন (অপ্রাপ্তবয়স্ক) | ৩৬ জন |
অংশীজন, গবেষক ও কর্তৃপক্ষের মতামত
মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষকদের মতে, কওমি মাদ্রাসাগুলোর একটি বিশাল অংশ আবাসিক হওয়ায় এবং সেখানে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা নিখরচায় পড়ার সুযোগ পাওয়ায় অভিভাবকদের নজরদারি কম থাকে। এর সুযোগ নিয়ে এক ধরণের বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বেশিরভাগ মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নবিরোধী প্রতিরোধ সেল বা কার্যকর সিসিটিভি মনিটরিং নেই।
অন্যদিকে, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলোর মতে—
কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক): তারা অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বললেও প্রায় ১৫ হাজারের মতো অনিবন্ধিত কওমি মাদ্রাসা তাদের মনিটরিং ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে।
আলিয়া মাদ্রাসা বোর্ড: তারা অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত ও ফৌজদারি ব্যবস্থার আশ্বাস দেয়, তবে তাদের অধীনে আসা অভিযোগের সংখ্যা সীমিত বলে দাবি করে।
একশ্রেণীর শিক্ষক ও পরিচালকদের দাবি: অপরাধের কথা স্বীকার করলেও একটি পক্ষ বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘কাঠামোগত অপপ্রচার’ চালাচ্ছে।
বিদ্যমান আইন ও উত্তরণের পথ
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে ছেলে ও মেয়ে উভয় শিশুর ওপর সংঘটিত যেকোনো যৌন অত্যাচার বা বলাৎকার ধর্ষণের আওতাভুক্ত এবং আদালতের বিচারে এর সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে মৃত্যুদণ্ড।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি উত্তরণে জরুরি পদক্ষেপগুলো হলো:
১. দেশে গড়ে ওঠা প্রতিটি অনাবাসিক ও আবাসিক মাদ্রাসাকে বাধ্যতামূলক সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আনা।
২. হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী নিরপেক্ষ ব্যক্তি ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে প্রতিটি মাদ্রাসায় স্বাধীন ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল’ গঠন করা।
৩. স্থানীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক সালিশের মাধ্যমে যৌন অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা আইনত দণ্ডনীয় করা।
৪. শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন এবং সিসিটিভিসহ প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি বৃদ্ধি করা।










