চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহাসিক লালদীঘির পাড়স্থ জেলা পরিষদ ভবনে অবস্থিত অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির লালদীঘি পূর্ব কর্পোরেট শাখার ক্যাশ ভল্ট থেকে গ্রাহকদের আমানতের ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও হিসাব ব্যবস্থার চরম অসংগতি প্রকাশ পাওয়া এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শাখার ক্যাশ ইনচার্জ ও তার এক সহযোগীকে ইতোমধ্যেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে কারাদণ্ডে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে।
Table of Contents
হিসাবের গরমিল ও অভিনব প্রতারণা
মামলা ও ব্যাংক সূত্র জানায়, ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মো. কামরুল হোসেন (৪১) দীর্ঘ দিন ধরে উক্ত কর্পোরেট শাখার ক্যাশ ও ভল্ট পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। গত ৯ আগস্ট সাধারণ ব্যাংকিং লেনদেন শেষে ভল্টে রক্ষিত ক্যাশ এবং হিসাবের খাতার মিল দেখতে গিয়ে কর্মকর্তাদের চোখে বিপুল টাকার ঘাটতি ধরা পড়ে। পরবর্তীকালে নিবিড় নিরীক্ষায় ব্যাংকের ভল্টে ক্যাশের সমপরিমাণ খাতাপত্রের মেলা থাকলেও বাস্তবে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
তদন্ত ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের নথিপত্র অনুযায়ী, অভিযুক্ত কর্মকর্তা অত্যন্ত চতুরতার সাথে ভল্টের অর্থ সরিয়ে আসছিলেন। ১ হাজার টাকার প্রতিটি বড় বান্ডিলের ভেতরে ১০০ টাকা কিংবা তার চেয়ে কম মূল্যমানের ছোট নোট গুঁজে দিয়ে বান্ডিল সাজানো হতো। ফলে বাইর থেকে দেখলে বান্ডিলগুলো সম্পূর্ণ ও সঠিক মনে হলেও ভেতরে অর্থমূল্য ছিল বেশ কম। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে সংগৃহীত অর্থ পরবর্তীতে অবৈধভাবে ব্যাংকের বাইরে ব্যাংকিং নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে বিনিয়োগ করা হয়।
গরুর খামারে বেআইনি বিনিয়োগের অভিযোগ
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ভল্ট থেকে সরানো এই বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যবসায় খাটানোর উদ্দেশ্যে মো. জাফরুল্লাহ তানভীর (২৫) নামে এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়। তানভীরের তদারকিতে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার উত্তর বুড়িশ্চর এলাকায় ‘ইশরাত এগ্রো’ নামে একটি গবাদিপশুর খামার গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে সেখানে ৫০ থেকে ৬০টি বিভিন্ন উন্নত জাতের গরু রয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
আইনি প্রক্রিয়া ও পুলিশের তদন্ত
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি লালদীঘি পূর্ব কর্পোরেট শাখার জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদ বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেন ও জাফরুল্লাহ তানভীরকে প্রধান আসামি করার পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত করছেন কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন। তিনি জানান, এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। আসামিদ্বয়ের নিকট থেকে:
দুটি আধুনিক মোবাইল ফোন,
হোয়াটসঅ্যাপে তথ্য আদান-প্রদানের ডিজিটাল রেকর্ড এবং
৬৪ গিগাবাইটের (GB) একটি গুরুত্বপূর্ণ পেনড্রাইভ জব্দ করা হয়েছে।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া ও আইনি তদারকির দাবি
গ্রেপ্তারকৃত জাফরুল্লাহ তানভীরের বাবা আজিম উল্লাহ পুরো ঘটনাটিকে সাজানো ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন। তার মতে, তার ছেলে ব্যাংকের কর্মকর্তা বা গ্রাহক কোনোটিই নন। আগে থেকেই গরুর খামার পরিচালনা করা তানভীরকে রাতে ফোন করে ব্যাংকে ডেকে নিয়ে কৌশলে স্ট্যাম্পে সই নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা তার ছেলেকে দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক বা ব্যাংকিং প্রমাণ দেখাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে চট্টগ্রাম জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আনোয়ার হোসেন জানান, ব্যাংকের ভল্ট থেকে এই আকারের বিপুল অর্থ উধাও হওয়ার পেছনে কেবল একজন নিম্নস্তরের ক্যাশ ইনচার্জের একার হাত থাকা অসম্ভব। শাখা ব্যবস্থাপনার তদারকি, ভেতরের নিয়মিত অডিট এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর বড় ধরনের ঘাটতি ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।









