জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

মক্কার আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সেরা জাকারিয়া

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে অনুষ্ঠিত ৪৬তম কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন বাংলাদেশের পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার হাফেজ নূর উদ্দিন জাকারিয়া। বিশ্বের ১৩৩টি দেশের শত শত প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে প্রতিযোগিতার চতুর্থ শাখায় সেরা হওয়ার এই কৃতিত্বে গর্বিত বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আনন্দে ভাসছে তার পরিবার, নিজ গ্রাম চাঁদকাঠী এবং পুরো বাউফল উপজেলা।

বুধবার ১৯ আগস্ট প্রতিযোগিতার ফল ঘোষণা করা হয়। ফল প্রকাশের পর জাকারিয়ার সাফল্যের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বৃহস্পতিবার ২০ আগস্ট তা নিজ এলাকায় পৌঁছালে ধুলিয়া ইউনিয়নের চাঁদকাঠী গ্রামের বাড়িতে স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়। ছোটবেলায় কুরআন হিফজের যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রথম স্থান অর্জনের মধ্য দিয়ে তার সেই দীর্ঘ সাধনা পেল বড় স্বীকৃতি।

জাকারিয়া চাঁদকাঠী গ্রামের মাওলানা নুরুল আমিন ও ইয়ানুর বেগম দম্পতির ছেলে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি মেঝ। শৈশব থেকেই পবিত্র কুরআন মুখস্থ করার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। মাত্র ছয় বছর বয়সে মামা হাফেজ ক্বারী মোহাম্মদ রহমত উল্লাহর হাত ধরে তিনি ঢাকায় যান। সেখানে একটি মাদ্রাসার হেফজ বিভাগে ভর্তি হয়ে নিয়মিত অধ্যয়ন, মুখস্থ করা এবং পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে কুরআনের হাফেজ হন।

হিফজ সম্পন্ন করার পরও পড়াশোনার পথ থামাননি জাকারিয়া। পরবর্তী সময়ে আলিয়া ডিগ্রি অর্জনের লক্ষ্যে ডেমরার আর রায়হান ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি কুরআন তিলাওয়াত ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজের দক্ষতা আরও শাণিত করার সুযোগ পান। ওই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই তিনি সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করেন।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কুরআন প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন শুধু মুখস্থ জ্ঞান দিয়ে সম্ভব নয়। প্রতিযোগীদের নির্ভুলভাবে আয়াত উপস্থাপন, তিলাওয়াতের শুদ্ধতা, স্মরণশক্তি এবং নির্ধারিত মূল্যায়ন পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা দেখাতে হয়। ফলে জাকারিয়ার প্রথম স্থান অর্জন তার দীর্ঘদিনের অনুশীলন, অধ্যবসায় ও প্রস্তুতিরই গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ধুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম জাকারিয়ার সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এই অর্জন শুধু জাকারিয়ার পরিবারের জন্য নয়, পুরো ইউনিয়ন ও বাউফলবাসীর জন্য গর্বের বিষয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন সাফল্য এলাকার মানুষের মধ্যে নতুন উৎসাহ তৈরি করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এলাকার তরুণ সমাজসেবক হুজাইফা ইসলামও জাকারিয়ার অর্জনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকারী জাকারিয়া তরুণদের সামনে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার সাফল্য নতুন প্রজন্মকে কুরআন শিক্ষা, হিফজ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করতে পারে।

পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদও জাকারিয়াকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি চাঁদকাঠীর এই কৃতী সন্তানের সাফল্যে শুভেচ্ছা জানান। বিশ্বের ১৩৩টি দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মক্কার আন্তর্জাতিক কুরআন হিফজ, তিলাওয়াত ও তাফসির প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করায় তিনি জাকারিয়ার প্রশংসা করেন।

জাকারিয়ার সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চাঁদকাঠী গ্রামে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। স্বজনদের আনন্দে যোগ দিয়েছেন প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ছয় বছর বয়সে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে কুরআন শিক্ষার যে পথচলা শুরু হয়েছিল, বহু বছরের অধ্যবসায়ের পর সেই পথ তাকে নিয়ে গেছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতার মঞ্চে।

জাকারিয়ার এই অর্জন শুধু একটি প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান পাওয়ার ঘটনা নয়। এটি তার পরিবার ও শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের শ্রমেরও স্বীকৃতি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের একজন তরুণ হাফেজের আন্তর্জাতিক সাফল্য দেশের ধর্মীয় ও শিক্ষাঙ্গনেও অনুপ্রেরণার বার্তা বহন করছে। বাউফলের প্রত্যন্ত গ্রামের এক শিশুর কুরআন শিক্ষার পথচলা মক্কার আন্তর্জাতিক মঞ্চে যে সম্মান এনে দিয়েছে, তা এখন স্থানীয় মানুষের আনন্দের পাশাপাশি দেশের জন্যও গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর