ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ঘুরতে বের হয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই সৌদিপ্রবাসীসহ তিন তরুণের মৃত্যু হয়েছে। যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের নওপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই একজনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অপর দুজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাতের দিকে তাঁদেরও মৃত্যু হয়।
নিহত তিনজন হলেন নগরকান্দা উপজেলার হাসনহাটি গ্রামের দলিল উদ্দিন মণ্ডলের ছেলে চয়ন মোল্লা (২৩), একই গ্রামের আজগর মোল্লার ছেলে সিয়াম মোল্লা (২৩) এবং এনায়েত হোসেনের ছেলে নয়ন হোসেন (২১)। চয়ন ও সিয়াম সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। নয়নও আগে বিদেশে ছিলেন। তিনজনের বাড়ি একই গ্রামে এবং বয়স কাছাকাছি হওয়ায় তাঁদের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার বিকেলে চয়ন তাঁর দুই বন্ধু সিয়াম ও নয়নকে সঙ্গে নিয়ে নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া এলাকা থেকে মোটরসাইকেলে ভাঙ্গার দিকে ঘুরতে বের হন। তাঁরা ভাঙ্গা গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় কিছু সময় ঘোরাঘুরি করেন। সন্ধ্যার দিকে বাড়ির উদ্দেশে ফেরার সময় তাঁদের সঙ্গে ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে মোটরসাইকেলটি ভাঙ্গা পৌরসভার নওপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের অভিঘাতে মোটরসাইকেলে থাকা তিনজনই গুরুতর আহত হন। চয়ন মোল্লা ঘটনাস্থলেই মারা যান।
স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় আহত সিয়াম ও নয়নকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁদের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার দিকে নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু রাত প্রায় ১০টার দিকে কেরানীগঞ্জ এলাকায় অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যেই তাঁদের মৃত্যু হয়। স্বজনদের কাছে আনন্দের একটি সন্ধ্যা মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকের রাতে।
নিহত চয়ন মোল্লা সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। গত ঈদুল আজহার ছুটিতে তিনি দেশে ফিরেছিলেন। বন্ধু সিয়াম মোল্লাও সৌদিপ্রবাসী ছিলেন এবং দুর্ঘটনার মাত্র প্রায় ২০ দিন আগে দেশে এসেছিলেন। প্রবাসজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও দেশে ফেরার পর বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগটি তাঁর জীবনের শেষ আনন্দগুলোর একটি হয়ে রইল।
নয়ন হোসেনও কিছুদিন কুর্দিস্তানে ছিলেন। প্রায় এক বছর আগে দেশে ফিরে তিনি নগরকান্দা এলাকায় একটি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানে মোটরসাইকেলে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছিলেন। ফলে মোটরসাইকেল চালানো তাঁর দৈনন্দিন কাজেরই অংশ ছিল। কিন্তু মহাসড়কে ভারী যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ভয়াবহতা তাঁর জীবন কেড়ে নিল।
স্থানীয় লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. কাইয়ুম মিয়া জানান, তিন তরুণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। তাঁরা প্রায়ই একসঙ্গে চলাফেরা করতেন। শনিবার রাতে চয়ন মোল্লার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন সকালে নয়ন ও সিয়ামের মরদেহ তাঁদের গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। একই গ্রামের তিন বন্ধুর একসঙ্গে এমন মৃত্যুতে স্বজনদের পাশাপাশি পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
দুর্ঘটনার পর যে বাসটির সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ হয়েছিল, সেটি ঘটনাস্থলে না থেমে চলে যায়। ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার সার্জেন্ট আজাদুর রহমান জানিয়েছেন, বাসটি এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ বাসটির সন্ধান এবং চালককে শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে। মহাসড়কে মোটরসাইকেল চালানোর সময় বিপরীত দিকের যানবাহন, গতি ও রাস্তার পরিস্থিতি সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা জরুরি। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পর কোনো যানবাহন ঘটনাস্থল ত্যাগ করলে সেটি শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার ঘোরাঘুরি শেষে তিন বন্ধুর একসঙ্গে বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু একটি সংঘর্ষে থেমে গেল তিনটি তরুণ জীবন। প্রবাসে থাকা দুই বন্ধুর স্বজনেরা হারালেন তাঁদের প্রিয়জনকে, আর নয়নের পরিবার হারাল কর্মজীবন শুরু করা এক তরুণকে। হাসনহাটি গ্রামের এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বাসটি কবে শনাক্ত হবে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণই বা কী ছিল।









