ঢাকার কেরানীগঞ্জে সরকারি খাল খনন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি ও যুবদল নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দোকান মালিকদের কাছ থেকে অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নাম ব্যবহার করে খালের পাশে থাকা দোকান উচ্ছেদ ঠেকানোর আশ্বাস দেওয়া হয়। এ জন্য ব্যবসায়ীদের কাছে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা চাওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কেরানীগঞ্জের ভাগনা হিজলতলা এলাকার দিঘিরপাড় খালের দুই পাশে দীর্ঘদিন ধরে বেশ কিছু দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সরকারি উদ্যোগে ওই এলাকায় খাল খনন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হওয়ায় খালের জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা স্থাপনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারী দোকান মালিকদের ভাষ্য, এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েই কয়েকজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা তাঁদের কাছে অর্থ দাবি করেছেন।
অভিযোগের সঙ্গে কালিন্দী ইউনিয়ন বিএনপির নেতা লিটন ঢালী, জাহিদ এবং স্থানীয় যুবদল নেতা সবুজের নাম এসেছে। কয়েকজন দোকান মালিকের দাবি, তাঁদের বলা হয়েছিল প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দোকান উচ্ছেদ থেকে রক্ষা করতে অর্থ দিতে হবে।
একজন দোকান মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, তাঁর কাছে ১৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। তাঁকে বলা হয়, ওই অর্থ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করার জন্য প্রয়োজন। টাকা দিলে দোকান উচ্ছেদ করা হবে না বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর দাবি। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থ না দিলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দোকান ভেঙে দেওয়া হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও তাঁকে জানানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আরেক দোকান মালিকের অভিযোগ, খালের পাশের অংশ পরিষ্কার করার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি জানতে পারেন, ওই এলাকায় খাল পরিষ্কার ও খননের কাজ সরকারি উদ্যোগেই পরিচালিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে নেওয়া টাকা তাঁকে ফেরত দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
এ ছাড়া আরও এক দোকান মালিকের কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট কথোপকথনের তথ্য অনুযায়ী, ওই ব্যবসায়ীর কাছেও প্রথমে তুলনামূলক বেশি অর্থ দাবি করা হয়েছিল। পরে তিনি নিজের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা জানালে টাকার অঙ্ক কমিয়ে ৯০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, অর্থ দাবির ঘটনা কেবল একজন বা দুজন দোকান মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খালের দুই পাশে থাকা আরও কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছেও বিভিন্ন অঙ্কের টাকা চাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দোকানের অবস্থান ও ধরন অনুযায়ী কারও কাছে এক লাখ টাকা, আবার কারও কাছে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে লিটন ঢালী তা সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের কারণে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে। অপর অভিযুক্ত জাহিদও অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তবে যুবদল নেতা সবুজ টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় একজন রাজনৈতিক নেতার নির্দেশে কয়েকজনের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল এবং পরে সেই অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে যাঁর নির্দেশে টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেছেন, ওই নেতার পরিচয় প্রকাশ করতে তিনি রাজি হননি।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশের বক্তব্য, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কিংবা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে থাকলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, সরকারি খাল খনন ও উচ্ছেদ কার্যক্রমের সুযোগ নিয়ে কেউ যেন ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি থাকা জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উমর ফারুক জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে ঢাকা-২ আসনের সংসদ সদস্য আমান উল্লাহ আমানের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এখন অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারা দোকান মালিকদের কাছে টাকা চেয়েছেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, টাকা নেওয়ার কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না এবং পরে অর্থ ফেরত দেওয়ার ঘটনা সত্য কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হতে পারে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি খাল খনন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ যেন স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে এবং একই সঙ্গে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত বা বৈধ ব্যবসায়ীদের বিষয়টিও নিয়ম অনুযায়ী বিবেচনা করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন ও প্রশাসনিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।









