টেস্ট ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল বদলে নেওয়ার দক্ষতা। টি-টোয়েন্টিতে ঠিক তার উল্টো চিত্র—মাত্র ১২০ বলের ইনিংসে দ্রুত রান, সাহসী শট এবং মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেওয়ার সামর্থ্যই বড় হয়ে ওঠে। ক্রিকেটের এই দুই ভিন্ন মেরুর সঙ্গে একই সময়ে মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়। ইংল্যান্ডের হ্যারি ব্রুক অবশ্য সেই কঠিন সমন্বয়ই করে চলেছেন।
টেস্ট ব্যাটিং র্যাঙ্কিংয়ে ৮৬১ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছেন ব্রুক। একই সময়ে টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং র্যাঙ্কিংয়েও তিনি আছেন শীর্ষ দশে, তাঁর অবস্থান নবম। অর্থাৎ লাল বল ও সাদা বল—দুই ধরনের ক্রিকেটেই বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন ২৭ বছর বয়সী এই ইংলিশ ব্যাটসম্যান। বর্তমান র্যাঙ্কিংয়ে ব্রুকই একমাত্র ক্রিকেটার, যিনি একই সঙ্গে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি—দুই ফরম্যাটের শীর্ষ দশে রয়েছেন।
ব্রুকের সাম্প্রতিক সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়। ইংল্যান্ডের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক হিসেবেও তিনি দলকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিচ্ছেন। অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর নেতৃত্বে ইংল্যান্ড ২৬টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচের ২৩টিতেই জয় পেয়েছে। সর্বশেষ সাফল্য এসেছে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজে।
সেই সিরিজে ব্যাট হাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ব্রুক। একটি সেঞ্চুরিসহ তাঁর সংগ্রহ ১৭০ রান। ফলে সিরিজসেরার পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি সিরিজ জয়ের মাধ্যমে ইংল্যান্ডও টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান দখল করেছে, টপকে গেছে ভারতকে।
একই সময়ে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশে থাকা ক্রিকেট ইতিহাসে একেবারে বিরল নয়। তবে ব্রুকের বর্তমান অবস্থানের গুরুত্ব অন্য জায়গায়। তিনি শুধু দুই ফরম্যাটের দলে জায়গা ধরে রাখছেন না, বরং উভয় ক্ষেত্রেই কার্যকর পারফরম্যান্স করে র্যাঙ্কিংয়ের উঁচু অবস্থানে আছেন।
টেস্ট ক্রিকেটে একজন ব্যাটসম্যানকে অনেক সময় পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। নতুন বলের সুইং, পুরোনো বলের রিভার্স সুইং, উইকেটের পরিবর্তন এবং প্রতিপক্ষের দীর্ঘ স্পেল—সবকিছুর মধ্যেই টিকে থেকে রান করতে হয়। একটি ভালো ইনিংসের জন্য যেমন শট খেলার দক্ষতা দরকার, তেমনি কখন ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো, সেটিও বুঝতে হয়।
টি-টোয়েন্টিতে আবার হিসাবটা সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে সময় কম, সুযোগও কম। কয়েকটি ডট বলের পরপরই বড় শট খেলতে হতে পারে। একজন ব্যাটসম্যানকে দ্রুত বোলারের পরিকল্পনা বুঝতে হয় এবং ফিল্ডিং সাজানো অনুযায়ী নিজের শট বেছে নিতে হয়। ফলে টেস্টের দীর্ঘস্থায়ী মনোযোগ ও টি-টোয়েন্টির তাৎক্ষণিক আক্রমণাত্মক মানসিকতা একই খেলোয়াড়ের মধ্যে ধরে রাখা কঠিন।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচির কারণে সমস্যাটি আরও জটিল হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ। অনেক ক্রিকেটারকে তাই নির্দিষ্ট ফরম্যাটকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। কেউ দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেটে মনোযোগ দেন, আবার কেউ টি-টোয়েন্টির ব্যস্ত ক্যালেন্ডারে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন। দুই ফরম্যাটে নিয়মিত খেলার সুযোগ থাকলেও একই সঙ্গে সেখানে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পারফরম্যান্স ধরে রাখা আরও বড় চ্যালেঞ্জ।
টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানীয় ব্যাটসম্যানদের তালিকাই এর একটি ধারণা দেয়। ব্রুকের পরের অবস্থানগুলোতে রয়েছেন স্টিভ স্মিথ, জো রুট, ট্রাভিস হেড ও টেম্বা বাভুমা। তাঁদের মধ্যে হেড ছাড়া বাকি তিনজন বর্তমানে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিত নন বা ওই ফরম্যাটে জাতীয় দলের বিবেচনায় নেই। বিপরীত দিকেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ পাঁচে থাকা ঈশান কিষান, অভিষেক শর্মা, সাহিবজাদা ফারহান, ফিল সল্ট ও ডেভাল্ড ব্রেভিস টেস্ট ক্রিকেটে নিয়মিত খেলছেন না।
তাহলে ব্রুক কীভাবে দুই ফরম্যাটেই এতটা এগিয়ে? এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি নিজেই। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ইংল্যান্ড অধিনায়ক জানান, যতটা সম্ভব ইংল্যান্ডের হয়ে খেলাই তাঁর অগ্রাধিকার। ফিটনেস ঠিক রেখে জাতীয় দলের হয়ে নিয়মিত খেলতে চান তিনি। দ্য হানড্রেড ছাড়া অন্য কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে না খেলার সিদ্ধান্তও তাঁর এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত।
এই সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ হয়তো বাড়ছে। তবে শুধু নিয়মিত খেলা একজন ক্রিকেটারকে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে নিয়ে যায় না। সেখানে প্রয়োজন ধারাবাহিক রান, ম্যাচ পরিস্থিতি অনুযায়ী অবদান এবং দীর্ঘ সময় ধরে পারফরম্যান্স ধরে রাখার ক্ষমতা। ব্রুকের ক্ষেত্রে এই তিনটি দিকই একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে।
টেস্টে তাঁর ব্যাটিং তাঁকে বিশ্বের এক নম্বর অবস্থানে নিয়ে গেছে। আবার টি-টোয়েন্টিতে দ্রুত রান করার সক্ষমতা তাঁকে শীর্ষ দশে রেখেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নেতৃত্বের দায়িত্ব। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজে ১৭০ রান ও একটি সেঞ্চুরি তাঁর সাদা বলের ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সামর্থ্যের পরিষ্কার উদাহরণ।
আধুনিক ক্রিকেটে ফরম্যাটভিত্তিক বিশেষায়ন ক্রমেই বাড়ছে। টেস্ট ক্রিকেটের জন্য আলাদা প্রস্তুতি, টি-টোয়েন্টির জন্য আলাদা কৌশল এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ভিন্ন চাহিদা—সব মিলিয়ে একজন খেলোয়াড়ের ওপর চাপও বাড়ছে। সেই বাস্তবতায় ব্রুকের মতো ক্রিকেটার, যিনি একই সময়ে দুই ভিন্ন ফরম্যাটে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রভাব রাখছেন, স্বাভাবিকভাবেই আলাদা করে নজর কাড়েন।
ব্রুকের গল্প তাই শুধু দুটি র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশে থাকার গল্প নয়। এটি একজন ক্রিকেটারের অগ্রাধিকার, নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা এবং ভিন্ন পরিবেশে নিজের ব্যাটিংকে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার গল্প। টেস্টে বিশ্বের এক নম্বর এবং টি-টোয়েন্টিতে নবম—দুই অবস্থানই দেখাচ্ছে, ক্রিকেটের দুই বিপরীতধর্মী সংস্করণে নিজেকে কার্যকর করে তুলেছেন ইংল্যান্ডের এই ব্যাটসম্যান।
লাল বলের ক্রিকেটে যেখানে সময়কে নিজের পক্ষে আনতে হয়, সাদা বলের ক্রিকেটে সেখানে সময়ের আগেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে হয়। হ্যারি ব্রুক এখন দুই ক্ষেত্রেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে চলেছেন। তাঁর জন্য ইংল্যান্ডের হয়ে নিয়মিত খেলা যেমন অগ্রাধিকার, তেমনি সেই সুযোগকে পারফরম্যান্সে রূপ দেওয়াটাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় পরিচয়।









