জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ: বিপ্লবী ও মানবসেবী সুহাসিনী দাসের ত্যাগ ও সংগ্রাম

সুহাসিনী দাস—একটি নাম, একটি সাহসী সময়ের প্রতিচ্ছবি; যাঁর জীবনজুড়ে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং দেশ ও সমাজের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে পূর্ব বাংলার এই নির্ভীক নারী সংগঠক অসামান্য বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি ছিলেন একজন বীর সাহসী সংগঠক ও নিবেদিতপ্রাণ মানবসেবী।

১৯১৫ সালের ১৬ আগস্ট তৎকালীন আসাম প্রদেশের (বর্তমান বাংলাদেশ) সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সুহাসিনী দাস। তাঁর পিতা প্যারীমোহন রায় এবং মাতা শোভা রায়। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। বাল্যকাল থেকেই তাঁর মধ্যে সমাজকৈশিক দায়বদ্ধতা ও নেতৃত্বের গুণাবলী পরিলক্ষিত হয়।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে সিলেটের ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী কুমুদ চন্দ্র দাসের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে দাম্পত্য জীবনের সুখ তাঁর দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিবাহের মাত্র চার বছরের মাথায় আকস্মিকভাবে স্বামীর অকালমৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে মর্মাহত করে। তবে তিনি ভাঙেনি; সেই গভীর শোককে অপরাজিত শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি নিজের সমগ্র জীবনকে নিয়োজিত করেন নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে।

শ্বশুরবাড়ি থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বিপুল সম্পত্তির মাত্র সামান্য একটি অংশ নিজের জীবনধারণের জন্য রেখে বাকি প্রায় সমুদয় সম্পত্তি তিনি জনকল্যাণমূলক ও সামাজিক কাজে দান করে দেন। ব্যক্তিসম্পদের প্রতি কোনো মোহ প্রকাশ না করে মানুষের প্রতি ভালোবাসাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান ব্রত। প্রথমে সমাজসেবা দিয়ে কাজ শুরু করলেও সময়ের প্রয়োজনে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে সমগ্র ভারতে শুরু হয় ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন। এই আন্দোলনে পূর্ব বাংলায় ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। কারামুক্তির পর ১৯৪৬ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনেও তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থীদের পক্ষে দিনরাত প্রচারণা চালান ও সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এই আপসহীন আন্দোলন ও সাংগঠনিক দক্ষতা তাঁকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার নারী সমাজের এক দূরদর্শী ও সাহসী নেত্রীতে পরিণত করে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার রঙ্গিরকুল পাহাড়ে কংগ্রেস কর্মী ও স্থানীয় সমাজসেবকদের উদ্যোগে একটি মানবিক আশ্রম গড়ে তোলা হয়। সুহাসিনী দাস সেই আশ্রমে নিজেকে স্থায়ীভাবে যুক্ত করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোতে এই আশ্রমে তাঁর সাহসিকতা, বিচক্ষণতা ও অসীম মানবিকতা এক বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস সৃষ্টি করে।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে নির্বিচারে গণহত্যা, নারী নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগ চালাচ্ছিল, তখন জীবনের চরম ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সুহাসিনী দাস রঙ্গিরকুল আশ্রম ত্যাগ করেননি। বিপন্ন, গৃহহীন ও ভীতিসন্ত্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি আশ্রয় ও চিকিৎসার হাত বাড়িয়ে দেন। পাকিস্তানি বাহিনী একাধিকবার এই আশ্রমে হানা দিলেও সুহাসিনী দাসের উপস্থিত বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ও অকুতোভয় অবস্থানের কারণে আশ্রমটি বড় ধরনের ধ্বংসস্তূপ থেকে রক্ষা পায়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সক্রিয় রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরে এসে নিজেকে শতভাগ নিঃস্বার্থ সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের হস্তশিল্প ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলা, তাদের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ে তাঁর এই অতুলনীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে তিনি সম্মানিত হয়েছেন। ১৯৭৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও সংবর্ধনা প্রদান করে। এছাড়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সমাজসেবায় অসামান্য ও নিরবচ্ছিন্ন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৬ সালে তাঁকে সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় ‘সমাজসেবা পুরস্কার’-এ ভূষিত করে।

উপমহাদেশের অগ্নিযুগের এই প্রসংখ্যাত বিপ্লবি, মানবতার নির্ভীক সেবক ও মহান মুক্তিসংগ্রামী ২০০৯ সালের ২৪ মে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

সময়ের স্রোতে মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু মহীয়সী জীবন ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর হয়ে থাকে ত্যাগের অনন্য মহিমায়। সুহাসিনী দাস ছিলেন তেমনই এক প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন ও আদর্শ আমাদের শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অস্ত্রের চেয়ে হৃদয়ের সাহস এবং মানবসেবাই সবচেয়ে বড় শক্তি।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর