একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও সম-অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ হলো ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ (Secularism)। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে যে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির অন্যতম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, তা কোনো আকাশ থেকে পড়া আকাশকুসুম ধারণা ছিল না। তা ছিল ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬৬-র ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং পাকিস্তানি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এদেশের কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের বাস্তব সংগ্রাম থেকে অর্জিত এক রক্তস্নাত অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্মনিরপেক্ষতার মূল অর্থ ছিল—রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে প্রাধান্য দেবে না, ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকারের বৈষম্য করা যাবে না এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
কিন্তু আহমদ সফা যখন রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতার বিশ্লেষণে বসেন, তখন তিনি সেক্যুলারিজমের এই গণতান্ত্রিক ও সার্বজনীন মানবিক ভিত্তিকেই ধ্বংস করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হন। সফা ধর্মনিরপেক্ষতাকে এদেশের মানুষের জন্য এক “কৃত্রিম ইউরোপীয় বিলাসিতা”, “এলিটদের উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া ধারণা” এবং “সাধারণ মানুষের ধার্মিক অনুভূতির বিরোধী বিদেশি প্রপাগান্ডা” হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন। এই পর্বের মূল ময়নাতদন্ত হলো: কীভাবে ছফামন পপুলিজমের প্রচ্ছদে ধর্মনিরপেক্ষতার সেক্যুলার ভিত্তিকে পঙ্গু করে রাষ্ট্রকে উগ্র মেজোরিটারিয়ান (সংখ্যাগুরুবাদী) ধর্মীয় রাজনীতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
১. ধর্মনিরপেক্ষতার দেশীয় ঐতিহাসিক মূল বনাম ছফীয় ‘ইউরোপীয় আমদানি’র অপপ্রচার
পশ্চিম ইউরোপে সেক্যুলারিজমের বিকাশ ঘটেছিল রাষ্ট্র বনাম ক্যাথলিক চার্চের দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার বিকাশ ঘটেছিল ভিন্ন এক ঐতিহাসিক বাস্তবতায়—পাকিস্তানি ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্রের’ নামে চালানো গণহত্যা, বর্ণবাদ এবং ধর্মীয় শোষণের বিরুদ্ধে আপামর মানুষের বেঁচে থাকার ও মানবিক মর্যাদার লড়াই থেকে।
কিন্তু সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’, ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ এবং বিভিন্ন প্রবন্ধাবলীতে ধর্মনিরপেক্ষতার এই ঐতিহাসিক স্বতঃস্ফূর্ততাকে সম্পূর্ণরূপে চেপে যান। তিনি যুক্তি দেন যে, বাংলাদেশের সেক্যুলারিজম হলো ইউরোপের অন্ধ অনুকরণ ও কলকাতার বর্ণহিন্দু এলিটদের সাজানো এক কৃত্রিম ফ্রেম।
সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ (১৯৮১) গ্রন্থে লিখছেন:
“ইউরোপে সেক্যুলারিজমের জন্ম হয়েছিল চার্চের আধিপত্য ভাঙার জন্য। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে সেক্যুলারিজম নামে যা চালু করা হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের ঈমান ও ধর্মীয় অবচেতনকে তোয়াক্কা না করে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া এক ইউরোপীয় বিলাসিতা। কলকাতার অনুকরণে তৈরি এই সেক্যুলারিজম এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম মানসের কোনো প্রয়োজন মেটাতে পারেনি।”
- ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞাকে বিকৃত করা: সফা সেক্যুলারিজমকে “ধর্মহীনতা” বা “ধর্মের প্রতি শত্রুতা” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলেন, যা মূলত উগ্র মৌলবাদী দলগুলোর (যেমন: জামায়াতে ইসলামী) চিরাচরিত বয়ান।
- ইতিহাসের বিকৃতি: লালন, সুফি ঐতিহ্য, ১৯৫২-র অসাম্প্রদায়িক ভাষাপ্রেম এবং ১৯৭১-এর ধর্মীয় পাকিস্তান ভাঙ্গার যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা—সফা সেই পুরো দেশীয় ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে সেক্যুলারিজমকে কেবল “বিদেশি আমদানি” বলে উড়িয়ে দিলেন।
২. ‘জনগণের অনুভূতি’র পপুলিজম: সংখ্যাগুরুবাদী ফ্যাসিবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক তোষণ
আহমদ সফার রাজনৈতিক কৌশলের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো—তিনি সেক্যুলারিজমকে আক্রমণ করার জন্য “সাধারণ মানুষের অনুভূতি” (Mass Sentiment) নামক পপুলিস্ট কার্ডটি ব্যবহার করেছেন।
সফা যুক্তি দেন যে, যেহেতু পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধার্মিক মুসলিম, তাই রাষ্ট্র যদি ধর্মনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করে, তবে তা নাকি “জনগণের অনুভূতিকে আঘাত করা” এবং “তাদের ওপর পরধর্মীয় চেতনা চাপিয়ে দেওয়া”!
[রাষ্ট্রচিন্তায় সেক্যুলারিজম বনাম ছফীয় পপুলিজম]
│
┌───────────────────────────────┴───────────────────────────────┐
▼ ▼
[প্রগতিশীল সেক্যুলার রাষ্ট্রবিজ্ঞান] [ছফীয় পপুলিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি]
• ধর্মনিরপেক্ষতা হলো সকল নাগরিকের সমান অধিকারের ঢাল • সেক্যুলারিজম হলো 'ইউরোপীয় ও এলিটদের বিলাসিতা'
• ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার (আইনের চোখে সমান) • সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় অনুভূতিই রাষ্ট্রীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রক
• সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও অসাম্প্রদায়িক নীতি প্রধান • অসাম্প্রদায়িক নীতিকে 'মুসলিম অবচেতনের বিরোধী' আখ্যা দান
*ফলাফল:* সমানাধিকারভিত্তিক আধুনিক সেক্যুলার গণতন্ত্র *ফলাফল:* সংখ্যাগুরুবাদী ফ্যাসিবাদ ও সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ
“যে রাষ্ট্রনীতির সাথে এদেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ের কোনো সংযোগ নেই, যে নীতি সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান জানাতে শেখে না—তা শেষ পর্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীলতারই জন্ম দেয়। সেক্যুলারিজমের নামে এদেশের মানুষের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেই আজ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির এত প্রবৃদ্ধি।”
৩. সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ছাঁটাইয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুঘটক
১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সংবিধানে পরিবর্তন এনে ধর্মনিরপেক্ষতা উপড়ে ফেলেন (বিসমিল্লাহ সংযোজন ও ধর্মনিরপেক্ষতার অবলুপ্তি)। পরবর্তীতে আরেক সামরিক শাসক এরশাদ ১৯৮৮ সালে ৮ম সংশোধনীর মাধ্যমে ‘ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে ঘোষণা করেন।
এই যে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকাঠামোকে পঙ্গু করে দেওয়া সামরিক ও স্বৈরাচারী পদক্ষেপগুলো—এর পেছনে রাজনৈতিক বৈধতা জুগিয়েছিল আহমদ সফার এই “ধর্মনিরপেক্ষতা-বিরোধী” তাত্ত্বিক লেখালেখি।
- সামরিক শাসকরা যখন বলত: “ধর্মনিরপেক্ষতা এদেশের মানুষের মূল চেতনা নয়, এটি ভারতের চাপিয়ে দেওয়া জিনিস”, তখন তারা মূলত আহমদ সফার বইগুলোর উদ্ধৃতি ব্যবহার করত।
- সফা সেক্যুলারিজমকে “সুশীল এলিট ও কলকাতার তোষণ” বলে যা লিখেছিলেন, তা সামরিক শাসক ও ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের জন্য সোনার ডিম পেড়ে দেওয়া হাঁসে পরিণত হয়েছিল।
৪. বর্তমান বাংলাদেশে ‘সেক্যুলারিজম-বিদ্বেষে’র পেছনে ছফীয় ছায়া
আজকের বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ বা তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের মধ্যে ‘সেক্যুলারিজম’ শব্দটির প্রতি যে তীব্র অ্যালার্জি, বিদ্বেষ ও ভুল ধারণা গড়ে উঠেছে, তার প্রধান দায় আহমদ সফার।
- নাস্তিকতার তকমা দেওয়া: যখনই কোনো প্রগতিশীল চিন্তক, লেখক বা অ্যাক্টিভিস্ট অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের দাবি তোলেন, উগ্র ডানপন্থীরা তাঁদের “ইউরোপের দালাল” বা “নাস্তিক” বলে আক্রমণ করে—যার দার্শনিক ভিত গড়েছিলেন সফা।
- সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা: রাষ্ট্র যখন সেক্যুলারিজম থেকে বিচ্যুত হয় এবং “সংখ্যাগুরু মুসলিমদের অনুভূতি”কে নীতি নির্ধারণের মাপকাঠি বানায়, তখন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও নৃগোষ্ঠীর মানুষ নিজ দেশে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে পড়ে—যা সফার পপুলিস্ট ফ্রেমের সরাসরি ফল।
সেক্যুলারিজমের শত্রুকে চেনার সময়
ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো ইউরোপীয় দয়া নয়, কিংবা কোনো বিদেশি প্রপাগান্ডা নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা হলো একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রের বেঁচে থাকার প্রাথমিক শর্ত—বিশেষ করে বাংলাদেশ বৈচিত্র্যময় মানুষের ভূখণ্ড।
আহমদ সফা প্রগতির প্রচ্ছদ পরে এবং “সাধারণ মানুষের অনুভূতি”র দোহাই দিয়ে আসলে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিদেশি তকমা দিয়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অক্ষে উগ্র ধর্মীয় রাজনীতি ও মেজোরিটারিয়ান ফ্যাসিবাদের জন্য পথ পরিষ্কার করে গেছেন। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে চায়, তবে আহমদ সফার এই ‘ধর্মনিরপেক্ষতা-বিরোধী বিষাক্ত বয়ান’কে প্রগতির আদালত থেকে সম্পূর্ণরূপে খারিজ করতে হবে।







