খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জুন ২০২৬, ৫:৩৭ পিএম

বাংলাদেশের বীমা খাতকে আরও কার্যকর, আধুনিক ও জনমুখী করে তুলতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হলে বীমা খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের বিকল্প নেই।
শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীর বিজয়নগরের হোটেল একাত্তরে বাজেট-পরবর্তী এক সেমিনারে এসব মতামত উঠে আসে। ‘বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বীমা খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ)। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইআরএফের সভাপতি গোলাম মওলা।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি ছিলেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি সাঈদ আহমেদ (এমপি) এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দেশের বীমা খাত এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ডিজিটাল হয়নি। ফলে গ্রাহকসেবা, দাবি নিষ্পত্তি, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। তাঁর মতে, প্রযুক্তির পর্যাপ্ত ব্যবহার না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান দক্ষতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। একই সঙ্গে কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকির ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। তাই কৃষি, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ও সম্পদ সুরক্ষায় বীমা খাতকে আরও শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। এজন্য খাতভিত্তিক নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে আরও কার্যকর করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বীমা খাতের সংস্কারে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কাঠামো শক্তিশালী করা এবং খাতসংশ্লিষ্ট জনবলের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
তিনি জানান, বর্তমানে বীমা গ্রাহকদের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, কিছু সমস্যা পুরো খাতজুড়ে থাকলেও কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রিতে দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি জটিলতা রয়েছে। এসব দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে দুর্বল কোম্পানিগুলোকে কার্যকর নজরদারির আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি মাইক্রোইন্স্যুরেন্স চালু এবং সেবার চ্যানেল সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন, যাতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষও সহজে বীমা সুবিধার আওতায় আসতে পারেন।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাঈদ আহমেদ (এমপি) বলেন, বীমা কমিশনকে ব্যবসায়িক প্রভাব ও অনিয়ম থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখতে হবে। একই সঙ্গে মোটরযান বীমার পরিধি বাধ্যতামূলকভাবে আরও বিস্তৃত করা এবং নতুন নতুন খাতে বীমা সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী বলেন, দেশের বেশ কয়েকটি বীমা কোম্পানি মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রাহকের দাবি নিষ্পত্তি করে থাকে। কিন্তু এসব ইতিবাচক উদ্যোগ সাধারণ মানুষের সামনে খুব কমই আসে। বরং যেসব ক্ষেত্রে দাবি পরিশোধে বিলম্ব হয় বা বিতর্ক তৈরি হয়, সেগুলোই বেশি আলোচিত হয়। ফলে খাতের ইতিবাচক অর্জনও অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।
জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম নুরুজ্জামান বলেন, জীবন বীমা খাতের সংকট নন-লাইফ বীমার তুলনায় বেশি। অনেক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় জটিলতা রয়েছে। ব্যাংক ঋণ সহায়তা সহজ করা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা কার্যকর হলে এ সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দেশের বীমা খাত এখনো প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি। দেশে বীমার আওতায় আসা মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। এই প্রবেশযোগ্যতা বাড়ানো না গেলে খাতের সামগ্রিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হবে।
তিনি বলেন, দুর্বল নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, স্বল্পমেয়াদি লাভের মানসিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব বীমা শিল্পের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা। একই সঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা, কৃষি বীমা সম্প্রসারণ এবং আর্থিক খাতে নৈতিকতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, আর্থিক খাতে জবাবদিহি ও সুশাসনের ঘাটতি দূর না হলে বীমা খাতের টেকসই উন্নয়নও সম্ভব হবে না।
সেমিনারে বক্তারা অভিন্ন মত প্রকাশ করে বলেন, দেশের বীমা খাতকে নতুন উচ্চতায় নিতে হলে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বিস্তৃত করা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি সরকারের নীতিগত সহায়তা, বীমা কোম্পানিগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই এই খাতকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও শক্তিশালী অবদান রাখার সক্ষমতা দেবে।
মন্তব্য