,

বিরোধী কর্মসূচির আবহে মাঠে সংগঠিত হচ্ছে বিএনপি

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের ধারাবাহিক কর্মসূচি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন তৎপরতার অভিযোগ—সব মিলিয়ে মাঠের রাজনীতিতে নিজেদের উপস্থিতি আরও জোরালো করছে বিএনপি। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভ, মিছিল ও সমাবেশকে বিএনপির অভ্যন্তরীণভাবে ‘অঘোষিত’ কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দলটির নেতাদের ভাষ্য, এসব কর্মসূচি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের চাপের কারণে নয়। বিরোধী দলগুলোর বক্তব্যের জবাব দেওয়া, নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা এবং আওয়ামী লীগের তৎপরতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকাই এর উদ্দেশ্য।

তবে বিএনপির ভেতরে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে বলে দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। কারণ, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প এবং নিত্যপণ্যের বাজারে পড়তে পারে। এরই মধ্যে বিরোধী দলগুলো এই বিষয়টিকে তাদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ইস্যু করেছে।

সাংগঠনিক তৎপরতায় জোর

বিএনপি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা, মহানগর ও অন্যান্য সাংগঠনিক ইউনিটের নেতাদের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ বাড়ানো হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বিভাগের নেতাদের সঙ্গে সম্প্রতি ভার্চ্যুয়াল বৈঠক করেছে দলটি।

ওই বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত মৃধাসহ কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেন। দলীয় সূত্র বলছে, ঢাকা বিভাগের নেতাদের সঙ্গেও শিগগির বৈঠক হতে পারে। এতে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশ নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানা গেছে।

বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের এই বিস্তারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একদিকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলীয় সংগঠনকে সক্রিয় রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক মাঠের কর্মসূচির মধ্যেও নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি দৃশ্যমান রাখার চেষ্টা করছে।

বিরোধীদের কর্মসূচিতে জ্বালানি সংকট

বিএনপির এই তৎপরতার সময়েই জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট একের পর এক কর্মসূচি পালন করছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে জোটটি সেপ্টেম্বর মাসে দীর্ঘ পথের কর্মসূচি নেয়।

৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর লংমার্চের মধ্য দিয়ে বিরোধী জোট তাদের কর্মসূচি জোরদার করে। ১৯ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিতে জোটের আট দফা দাবির মধ্যে ছিল জ্বালানি ও সারসংকটের অবসান, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণ বন্ধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।

জোটের সমন্বয়ক এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার জনগণের দাবির বিষয়ে চাপ অনুভব করছে বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে বিএনপির নেতারা বলছেন, এসব কর্মসূচিকে তারা পর্যবেক্ষণ করছে এবং রাজনৈতিক বক্তব্য ও মাঠের কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানাচ্ছে।

জ্বালানির দাম বাড়ায় নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

এই রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেই ২১ সেপ্টেম্বর দেশের চার ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। নতুন দরে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়।

জ্বালানি | আগের দাম | নতুন দাম | বৃদ্ধি
ডিজেল | ১১৫ টাকা | ১৩৫ টাকা | ২০ টাকা
অকটেন | ১৪৫ টাকা | ১৬৫ টাকা | ২০ টাকা
পেট্রোল | ১৪০ টাকা | ১৬০ টাকা | ২০ টাকা
কেরোসিন | ১৩৫ টাকা | ১৫৫ টাকা | ২০ টাকা

মূল্যবৃদ্ধির পরপরই জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। তাদের বক্তব্য, সাধারণ মানুষ আগে থেকেই নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে রয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব কৃষি, শিল্প ও বাজারব্যবস্থার ওপরও পড়বে।

অন্যদিকে সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি আমদানি, পরিবহন ও বিমা ব্যয়ও বেড়েছে। প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে তুলনামূলক বেশি দাম থাকায় সীমান্তপথে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির কথাও সরকার উল্লেখ করেছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ওপর আর্থিক চাপও বেড়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি বিক্রিতে সংস্থাটির বড় ধরনের লোকসানের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিভিন্ন সময়ে মূল্য সমন্বয় নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

অক্টোবরে দাম অপরিবর্তিত

সেপ্টেম্বরে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির পর অক্টোবর মাসে নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি। ৩০ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অক্টোবরেও ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা লিটারে বিক্রি হবে।

অর্থাৎ, সেপ্টেম্বরের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অক্টোবরেও সরাসরি বহাল থাকছে। ফলে পরিবহন ও উৎপাদন খাতের ব্যয়, বাজারে পণ্যের দাম এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাব রাজনৈতিক বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

‘চাপের কারণে নয়’, বিএনপির বক্তব্য

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে ডিজেলের ক্ষেত্রে প্রতি লিটারে উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি বা লোকসান বহন করতে হবে।

বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রসঙ্গে রিজভীর বক্তব্য, বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচির কারণে বিএনপি চাপ অনুভব করছে—এমন ব্যাখ্যা সঠিক নয়। তাঁর দাবি, বিভিন্ন দলের বক্তব্য ও প্রচারের জবাব দেওয়া এবং জনগণের সামনে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করার প্রয়োজন থেকেই দলটি রাজনৈতিক কর্মসূচি করছে।

আওয়ামী লীগের তৎপরতা নিয়েও বিএনপির নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাস, অগ্নিসংযোগ এবং বাস-ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছে বিএনপি। তবে এসব অভিযোগ রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে এসেছে; প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্তের ফল আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিরোধীদের বক্তব্যও ভিন্ন

জামায়াতে ইসলামীর নেতারা অবশ্য বিএনপির এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন। এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের বক্তব্য, জ্বালানি সংকট সরকার ও বিরোধী দল—উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের কর্মসূচির উদ্দেশ্য সরকারকে সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী করা এবং জবাবদিহির আওতায় আনা।

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের সাম্প্রতিক কর্মসূচিগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার পর তাদের আন্দোলনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগের একটি সরাসরি যোগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে বিএনপি মাঠে সংগঠনকে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মসূচি বাড়াচ্ছে। বিরোধী দলগুলোও তাদের দাবি নিয়ে কর্মসূচি অব্যাহত রাখার কথা বলছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি ব্যয়, আইনশৃঙ্খলা এবং সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির জন্য একদিকে সরকারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া, অন্যদিকে দলের সাংগঠনিক উপস্থিতি ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর বিরোধী দলগুলোর জন্য জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে কেন্দ্র করে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো একটি বড় রাজনৈতিক বিষয়। দুই পক্ষের কর্মসূচি ও বক্তব্যের পাল্টাপাল্টিতে মাঠের রাজনীতিও আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।