ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়লেও এখনই দেশে ডেঙ্গুর টিকা চালুর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গাভি)সহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অনুমোদন বা সুপারিশ পাওয়া গেলে সরকার এ বিষয়ে চিন্তা করবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুর টিকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকার আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থাৎ দেশে রোগের প্রকোপ বাড়লেও শুধু বর্তমান পরিস্থিতির ভিত্তিতে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার পথে যাচ্ছে না সরকার। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টিকার কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং ব্যবহারের উপযোগিতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়ার পরই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকার ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা ও নীতিগত আলোচনা চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে কিছু ডেঙ্গু টিকার বিষয়ে মূল্যায়ন করেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে সংস্থাটি TAK-003 বা Qdenga নামের একটি ডেঙ্গু টিকাকে প্রিকোয়ালিফাই করে। ডব্লিউএইচওর সুপারিশ অনুযায়ী, উচ্চমাত্রার ডেঙ্গু সংক্রমণ এবং রোগের উল্লেখযোগ্য বোঝা রয়েছে—এমন এলাকায় নির্দিষ্ট বয়সী শিশুদের জন্য এই টিকা ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে কোনো টিকা আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত বা প্রিকোয়ালিফাইড হলেই প্রতিটি দেশে তা জাতীয় কর্মসূচির অংশ হয়ে যায় না। একটি দেশে টিকা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় স্থানীয় সংক্রমণের ধরন, রোগের বিস্তার, কোন বয়সের জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, টিকার সম্ভাব্য সুফল এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন। টিকা কতটা কার্যকর হবে এবং কোন জনগোষ্ঠীর মধ্যে তা সবচেয়ে বেশি জনস্বাস্থ্যগত সুবিধা দিতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপের কারণে টিকা নিয়ে আলোচনা নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। এডিস মশাবাহিত এই রোগ প্রতিবছর বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। আক্রান্তদের একটি অংশের জ্বর, শরীরব্যথা ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ডেঙ্গু গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। তখন রক্তক্ষরণ, শকসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে এবং হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রধান সেরোটাইপ রয়েছে। একজন ব্যক্তি একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হতে পারেন। ফলে কোনো একটি সময়ে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকলেও ভবিষ্যতে ডেঙ্গুর ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। এ কারণেই রোগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজন হয়।
টিকা নিয়ে সিদ্ধান্তের পাশাপাশি এডিস মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ এখনও ডেঙ্গু মোকাবিলার অন্যতম প্রধান উপায়। বাড়ি, নির্মাণস্থল, ছাদ, ড্রেন বা আশপাশে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশার প্রজনন হতে পারে। তাই নিয়মিতভাবে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা রোগের সংক্রমণ কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসার আওতায় আনাও জরুরি। বিশেষ করে জ্বরের সঙ্গে পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাবের মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ কমাতে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে আপাতত সরকারের অবস্থান স্পষ্ট—ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে তড়িঘড়ি করে কোনো কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর অনুমোদন, সুপারিশ ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন পাওয়ার পর পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা এবং রোগের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখাই সরকারের তাৎক্ষণিক করণীয় হিসেবে থাকছে। টিকার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির ওপর।









