পিরোজপুরের নেছারাবাদে শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ স্কুল ফিডিং কর্মসূচির ৩০ প্যাকেট দুধ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে ২৭ প্যাকেট দুধ কিনে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে। বাকি তিন প্যাকেট দুধ খেয়ে ফেলার কথা জানিয়েছেন অভিযুক্ত নাদিম মাহমুদ।
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের ১৪৮ নম্বর দক্ষিণ বিন্না কাইলান্তরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। নাদিম মাহমুদ সরকারি স্বরূপকাঠি কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এদিকে ঘটনাটি কয়েক দিন পর শিক্ষা অফিসকে জানানো এবং তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করার কারণে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নুরুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। তিন কর্মদিবসের মধ্যে তাঁকে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।
বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিন্না খালে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা উপলক্ষে পুলিশ ও স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতা-কর্মী বিদ্যালয়ে যান। অতিথিদের বসার ব্যবস্থা ও আপ্যায়নে তখন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ব্যস্ত ছিলেন। এই সুযোগে বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত দুধের প্যাকেটের মধ্য থেকে ৩০টি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে নাদিম মাহমুদ ও তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন যুবকের বিরুদ্ধে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মোসা. আশা বেগম বলেন, শিক্ষকরা অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকার সময় নাদিমসহ কয়েকজন যুবক লাইব্রেরিতে রাখা দুধ নিয়ে যান। পরে বিষয়টি তাঁদের নজরে আসে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) অভিযুক্তরা ২৭ প্যাকেট দুধ ফেরত দিয়েছেন। বাকি তিন প্যাকেট তাঁরা খেয়ে ফেলেছেন বলে জানান তিনি।
প্রধান শিক্ষক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, অতিথিদের আপ্যায়নের সময় তিনি ওয়াশরুমে গিয়েছিলেন। ওই সময় লাইব্রেরিতে রাখা দুধের মধ্য থেকে ৩০ প্যাকেট নিয়ে যাওয়া হয় বলে পরে জানতে পারেন। মাসের শেষ দিনে শিক্ষার্থীদের দুধ দেওয়ার সময় বিষয়টি তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়।
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পারেন, নাদিম মাহমুদের নেতৃত্বে কয়েকজন যুবক দুধ নিয়ে বিদ্যালয়ের আশপাশে বসে তা খেয়েছেন। তবে ঘটনার পর কয়েক দিন পার হয়ে গেলেও বিষয়টি শিক্ষা অফিসে জানানো হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে নাদিম মাহমুদ বলেন, তিনি ও তাঁর তিন বন্ধু বিদ্যালয় থেকে ৩০ প্যাকেট দুধ নিয়েছিলেন। এসব দুধ শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ ছিল—এ বিষয়টি তাঁরা জানতেন না বলে দাবি করেন তিনি। পরে বিষয়টি জানতে পেরে বুধবার দুপুরে বিদ্যালয়ে গিয়ে ডিলারের কাছ থেকে ২৭ প্যাকেট দুধ কিনে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন বলে জানান।
নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজক বিন্না ইয়ংমেন্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. মহিবুল্লাহ বলেন, নাদিম তাঁদের ক্লাবের সাংস্কৃতিক সম্পাদক। তিনি শুনেছেন, নাদিম ও তাঁর বন্ধুরা বিদ্যালয় থেকে ৩০ প্যাকেট দুধ নিয়েছেন। এসব দুধ শিশুদের জন্য বরাদ্দ ছিল—এ বিষয়টি তাঁরা বুঝতে পারেননি বলে তাঁকে জানানো হয়েছে। পরে ২৭ প্যাকেট দুধ ফেরত দেওয়া হয়। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ সামগ্রী বিদ্যালয় থেকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ঠিক হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নেছারাবাদ উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. ইমরান হোসেন সজিব বলেন, ঘটনাটি তাঁর নজরে এসেছে। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না। তবে নাদিমের কর্মকাণ্ডের দায় সংগঠন নেবে না এবং বিষয়টি তাঁর ব্যক্তিগত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঘটনার পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মঈনুল ইসলাম বলেন, ঘটনা ২৫ সেপ্টেম্বরের হলেও কয়েক দিন পার হওয়ার পরও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের বিষয়টি জানায়নি। এ কারণে প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাঁকে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এ ঘটনায় একদিকে শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ দুধ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের সত্যতা ও দায় নির্ধারণের বিষয় রয়েছে, অন্যদিকে ঘটনাটি সময়মতো শিক্ষা অফিসকে না জানানোর কারণও প্রশাসনিকভাবে বিবেচনায় এসেছে। ২৭ প্যাকেট দুধ ফেরত দেওয়া হলেও বাকি তিন প্যাকেটের বিষয়ে অভিযুক্তের বক্তব্য অনুযায়ী সেগুলো খাওয়া হয়েছে।
শিশুদের জন্য বরাদ্দ খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ও যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে এ ধরনের কোনো অনিয়ম বা ঘাটতি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের দ্রুত অবহিত করার প্রয়োজন রয়েছে। নেছারাবাদের ঘটনায় অভিযোগ, অভিযুক্তের বক্তব্য, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা এবং শিক্ষা অফিসের প্রশাসনিক পদক্ষেপ—সবকিছুই এখন আলোচনায় রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে শিক্ষা অফিসের তদন্ত বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হতে পারে। বর্তমানে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে, ৩০ প্যাকেট দুধ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে, ২৭ প্যাকেট পরে বিদ্যালয়ে ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং এ ঘটনায় প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।









