শহীদ কাজী নুরুন্নবী—বাবুল। একটি সম্ভাবনাময় জীবন, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন, লেখালেখির প্রতি আগ্রহ এবং নেতৃত্বের গুণ—সবকিছুই ছিল তাঁর সামনে। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের বদলে তিনি বেছে নেন দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম। শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় দেখে যেতে না পারলেও তাঁর জীবন ও আত্মত্যাগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
নওগাঁর কাজীপাড়ার এক শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেন কাজী নুরুন্নবী। তাঁদের পারিবারিক বাড়ির প্রধান ফটকে লেখা ছিল ‘লতা বিতান’। তাঁর বাবা কাজী সাখাওয়াত হোসেন এবং মা নূরুস সাবাহ রোকেয়া। ৩১ জুলাই ছিল তাঁর জন্মদিন।
শৈশব থেকেই মেধাবী, সংবেদনশীল ও সৃজনশীল হিসেবে পরিচিত ছিলেন নুরুন্নবী। তাঁর স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। সেই লক্ষ্যেই তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন শেষ বর্ষের ছাত্র। একই সময়ে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির আন্দোলন ক্রমেই স্বাধীনতার দাবিতে রূপ নিচ্ছিল। মার্চে শুরু হওয়া গণহত্যা ও সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রেক্ষাপটে বহু তরুণ শিক্ষার্থী পড়াশোনার স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত হন। নুরুন্নবীও সেই সময় নিজের ভবিষ্যতের চেয়ে দেশের স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেন।
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন থেকে মুক্তিযুদ্ধ
যে তরুণের হাতে থাকার কথা ছিল স্টেথোস্কোপ, যার সামনে ছিল রোগী দেখা ও মানুষের জীবন রক্ষার পেশা, সেই নুরুন্নবীই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিব বাহিনীর রাজশাহী বিভাগের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে তাঁর জীবনকথায় উল্লেখ পাওয়া যায়। যুদ্ধের কঠিন সময়ে তিনি স্বাধীনতার সংগ্রামে ভূমিকা রাখেন। তাঁর জন্য এটি ছিল নিজের নিরাপদ ভবিষ্যৎ ছেড়ে অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক এক পথে পা রাখার সিদ্ধান্ত।
নুরুন্নবীর জীবনকে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রেখেছে তাঁর ডায়েরিও। যুদ্ধের দিনগুলোতে তিনি নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। সেখানে দিনের ঘটনা, যুদ্ধের পরিস্থিতি, চারপাশের মানুষ এবং নিজের অনুভূতির কথা তুলে ধরতেন। ফলে তাঁর ডায়েরি শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতির দলিল নয়, সেই অস্থির সময়ের একজন তরুণের মানসিক জগতেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি লেখার প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর লেখার হাতও ছিল সুন্দর। জীবিত থাকলে চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি লেখালেখিতেও তিনি নিজস্ব পরিচয় তৈরি করতে পারতেন—তবে সেই সম্ভাবনা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।
১ অক্টোবরের পর আর ফেরেননি
১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হন কাজী নুরুন্নবী। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি রয়েছে।
নুরুন্নবী এরপর আর পরিবারের কাছে ফিরে আসেননি। তাঁর পরবর্তী পরিণতি সম্পর্কে পরিবারের কাছে নির্ভরযোগ্য কোনো সংবাদ পৌঁছায়নি। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে যখন দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে, তখনও তিনি নিখোঁজ ছিলেন।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। কিন্তু সেই বিজয়ের পতাকা নিজের চোখে দেখার সুযোগ হয়নি নুরুন্নবীর। তাঁর মতো অসংখ্য তরুণের জীবন থেমে গিয়েছিল স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয়ের আগেই।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁদের আত্মত্যাগ তাই কেবল ব্যক্তিগত শোকের বিষয় নয়; এটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বৃহত্তর মানবিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার অংশ।
স্মৃতিতে বেঁচে আছেন নওগাঁ ও রাজশাহীতে
কাজী নুরুন্নবীর স্মৃতি তাঁর জন্মস্থান নওগাঁ এবং শিক্ষাজীবনের প্রতিষ্ঠান রাজশাহী মেডিকেল কলেজে এখনও বহন করা হয়। তাঁর স্মরণে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের একটি ছাত্রাবাসের নামকরণ করা হয়েছে।
নওগাঁতেও তাঁর নাম স্মরণে রাখা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ‘পার নওগাঁ শহীদ কাজী নুরুন্নবী মার্কেট’ তাঁর স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত একটি স্থাপনা হিসেবে পরিচিত।
তবে এসব নাম ও স্থাপনার বাইরেও তাঁর স্মৃতির সবচেয়ে বড় পরিসর হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস। তিনি যে সময়ের তরুণ ছিলেন, সেই সময়ে ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অনেকের জীবনকে একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছিল। নুরুন্নবীর জীবন সেই বাস্তবতারই একটি মর্মস্পর্শী উদাহরণ।
তিনি চিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন। লিখতে ভালোবাসতেন। নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করতেন। সামনে ছিল দীর্ঘ জীবনের সম্ভাবনা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনের সেই স্বাভাবিক গতিপথ থামিয়ে দেয়।
জন্মদিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ
৩১ জুলাই তাঁর জন্মদিনে শহীদ কাজী নুরুন্নবীকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধার জীবনকথা মনে করা নয়। একই সঙ্গে মনে করা সেই প্রজন্মকে, যাদের অনেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দেখার আগেই প্রাণ হারিয়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন।
নুরুন্নবী বিজয়ের পতাকা দেখে যেতে পারেননি। তাঁর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নও পূর্ণ হয়নি। ডায়েরির পাতায় যে জীবন ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ধরা পড়েছিল, সেটিও অসমাপ্ত থেকে গেছে।
তবু তাঁর নাম মুছে যায়নি।
নওগাঁর পারিবারিক স্মৃতি, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা তাঁকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় করে রেখেছে।
শহীদ কাজী নুরুন্নবীর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয়ের কাহিনি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য অসমাপ্ত জীবন, অপূর্ণ স্বপ্ন এবং পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পঙ্ক্তি যেন সেই আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করে—
“নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।”
বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মেধাবী ছাত্র, ছাত্রনেতা ও শহীদ কাজী নুরুন্নবী—বাবুলকে তাঁর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়। তাঁর জীবন থেমে গেলেও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর নাম রয়ে গেছে এক অসমাপ্ত স্বপ্নের প্রতীক হয়ে।









