জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎও কি অন্ধকারে?

তীব্র গরমের মধ্যে দেশে বিদ্যুৎ সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। গ্যাসের ঘাটতির কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এতে জনজীবনের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। দিনের প্রচণ্ড গরম এবং রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে নিয়মিত পড়ার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেও রাতের বেলায় এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটছে।

শিক্ষার্থীদের জন্য সমস্যাটি শুধু পড়ার সময় কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যুৎ না থাকলে গরমের কারণে ঘরে বসে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। রাতে একই সঙ্গে পাখা বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘুমেও ব্যাঘাত ঘটে। ফলে পরদিন ক্লাস, পড়াশোনা কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে পরীক্ষার্থী ও উচ্চশিক্ষায় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা বেশি সমস্যায় পড়ছেন। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের লিখিত পরীক্ষা ২ জুলাই শুরু হয়ে ৮ আগস্ট শেষ হয়েছে। পরীক্ষা চলাকালেও বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছিল। পরীক্ষার্থীদের নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছিল। এতে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিদ্যুৎ ঘাটতি ছাড়িয়েছে তিন হাজার মেগাওয়াট

সাম্প্রতিক উৎপাদন ও চাহিদার হিসাবেও সংকটের মাত্রা স্পষ্ট। ১১ আগস্ট মধ্যরাতে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৫২৩ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৯৩১ মেগাওয়াট।

এর পরদিন ১২ আগস্ট বিকেল ৩টায়ও ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট। এর আগে ৯ আগস্ট একপর্যায়ে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট এবং ১০ আগস্ট তা বেড়ে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। সাম্প্রতিক এই ঘাটতি ২০২৩ সালের ২৭ জুনের সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।

গ্রামাঞ্চলে সংকটের তীব্রতা আরও বেশি। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। ময়মনসিংহের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎহীনতার সময় ১০ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেছে। সিলেট ও বরিশালের কয়েকটি এলাকাতেও ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিংয়ের খবর রয়েছে।

রাজধানীতেও এবার বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। ১৪ আগস্টের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বসুন্ধরা, ইস্কাটন, কাজীপাড়া, মৌচাক, কারওয়ান বাজার, পান্থপথ, পশ্চিম রাজাবাজার ও মোহাম্মদপুরের কিছু এলাকায় রাতের দিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কথা উঠে আসে।

ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির অধীন এলাকায় গড় বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ২ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির অধীন এলাকায় চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৪৪০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উভয় বিতরণ ব্যবস্থায় গড়ে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট করে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

জ্বালানি সংকটেই উৎপাদনে বড় বাধা

বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট হলেও প্রয়োজনীয় গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি না থাকায় অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের প্রয়োজন প্রায় ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু ১১ আগস্ট এসব কেন্দ্র পেয়েছে মাত্র ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। গ্যাসের অভাবে ১৬টি গ্যাসভিত্তিক এবং পাঁচটি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ছিল। আরও ৩৪টি কেন্দ্র সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করছিল।

জুলাইয়ের শেষ দিকে মহেশখালীর একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনালে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সামিটের ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না থাকায় সেই সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

অনলাইননির্ভর পড়াশোনাতেও বাড়ছে ভোগান্তি

বর্তমানে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার একটি বড় অংশ বিদ্যুৎনির্ভর। অনলাইন ক্লাস, ভিডিও পাঠ, ডিজিটাল বই, নমুনা পরীক্ষা এবং ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কম্পিউটার ও মুঠোফোনের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ চলে গেলে এসব কার্যক্রম অনেক সময় বন্ধ হয়ে যায়।

মোহাম্মদপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জিনাত রেদওয়ানা জানান, কলেজে ক্লাস চলার সময়ও বিদ্যুৎ চলে যায়। বাসায় সন্ধ্যার পর একাধিকবার লোডশেডিং হওয়ায় পড়াশোনায় আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। রাতে ঘুম ঠিকমতো না হওয়ায় পরদিন ক্লাসেও ক্লান্তি থাকে বলে জানান তিনি।

গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সমস্যাটি আরও প্রকট। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার আলীপুর মডেল কলেজের অধ্যক্ষ সাইফুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার কারণে কৃষিকাজের সেচ যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এইচএসসি পরীক্ষার্থীরাও বিদ্যুৎ সংকটে সমস্যায় পড়েছে বলে তিনি জানান।

গরমের সঙ্গে মশার উৎপাতেও দুর্ভোগ

লোডশেডিংয়ের সময় গরমের পাশাপাশি মশার উৎপাতও নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। সন্ধ্যার পর অনেককে মশার কারণে জানালা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। জানালা খুললে মশা ঘরে ঢোকে, আবার বন্ধ রাখলে গরম ও অস্বস্তি বাড়ে। রাতে পাখা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দও ব্যাহত হচ্ছে।

এর সঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ১৭ হাজার ৮৮০ ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ৫৯ জনের। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় ঢাকা বিভাগ শীর্ষে রয়েছে। আগস্টের পাশাপাশি সেপ্টেম্বরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় গরম ও মশার উৎপাত শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকির পরিবেশ তৈরি করছে।

কৃষি ও শিল্পেও পড়ছে বিদ্যুৎ সংকটের চাপ

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শিক্ষা খাতের বাইরে কৃষি, ব্যবসা ও শিল্পেও ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সেচব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। দোকানপাট, ওয়ার্কশপ, চালকলসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে কাজের গতি কমছে। শিল্পকারখানার অনেক প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন কমাতে কিংবা কাজের সময়সূচি পরিবর্তন করতে হচ্ছে। কেউ কেউ অতিরিক্ত ব্যয়ে জ্বালানিচালিত বৈদ্যুতিক উৎপাদক যন্ত্র ব্যবহার করছেন, ফলে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।

তবে শিক্ষার্থীদের ক্ষতির ধরন আলাদা। কোনো কারখানার উৎপাদন কয়েক ঘণ্টা পিছিয়ে গেলে পরে তা কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু একজন পরীক্ষার্থীর নির্দিষ্ট সময়ের পড়াশোনা নষ্ট হলে সেই সময় সব ক্ষেত্রে পরে পূরণ করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে পরীক্ষা, ভর্তি প্রস্তুতি কিংবা নির্ধারিত অনলাইন ক্লাসের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্বাভাবিক সরবরাহের অপেক্ষায় শিক্ষার্থীরা

গ্যাস সরবরাহের সংকট ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতির কারণে সরকার বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী আনিন্দ্য ইসলাম আমিতও গ্যাস সরবরাহের সমস্যাকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়নি।

এইচএসসি ও সমমানের লিখিত পরীক্ষা শেষ হলেও শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম থেমে নেই। ফল প্রকাশের অপেক্ষা, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন শ্রেণির নিয়মিত পড়াশোনা—সব ক্ষেত্রেই বিদ্যুতের প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষ করে অনলাইন ও ডিজিটাল শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘ লোডশেডিং বাড়তি বাধা তৈরি করছে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শুধু পড়াশোনা বন্ধ হচ্ছে না, অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের সুযোগও হারাতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকটকে কেবল সাধারণ লোডশেডিং হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতির কারণে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব একই সঙ্গে শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা ও শিল্প খাতে পড়ছে।

শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ক্ষতি হচ্ছে পড়াশোনার সময় কমে যাওয়া, ঘুমের ব্যাঘাত এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়া। সামনে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম, ভর্তি প্রস্তুতি ও বিভিন্ন পরীক্ষা থাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে জ্বালানি সরবরাহ কত দ্রুত স্বাভাবিক করা যায়, তার ওপরই আগামী দিনের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর