বিদেশে পাঠানোর নামে ৩২ লাখ টাকা আত্মসাৎ: মানিকগঞ্জে প্রতারক দম্পতি কারাগারে

অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চ বেতনে চাকরির ভুয়ো প্রলোভন দেখিয়ে ৩২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার এক দম্পতিকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার (২৭ এপ্রিল, ২০২৬) দুপুরে মানিকগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪ এর বিচারক আসামিদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর এই আদেশ প্রদান করেন। অভিযুক্তরা তাঁদের প্রতিবেশীদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে মামলার নথিপত্রে প্রমাণিত হয়েছে।

অভিযুক্তদের পরিচয় ও প্রতারণার প্রেক্ষাপট

কারাগারে প্রেরিত অভিযুক্তরা হলেন মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার চালা ইউনিয়নের ষট্টি গ্রামের সালাম মুল্লার ছেলে মো. জহিরুল ইসলাম এবং তাঁর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, এই দম্পতি তাঁদের প্রতিবেশী বাদল বিশ্বাস ও মো. দেলোয়ার হোসেনকে অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চ বেতনে পাঠানোর নিশ্চয়তা প্রদান করেন। অভিযুক্তদের চতুর কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন সময়ে তাঁদের হাতে নগদ মোট ৩২ লাখ টাকা তুলে দেন।

দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও আসামিরা তাঁদের বিদেশে পাঠাতে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে ভুক্তভোগীরা নিজেদের পাসপোর্ট ও টাকা ফেরত চাইলে অভিযুক্তরা তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। অভিযোগ রয়েছে, পাওনা টাকা ফেরত চাওয়ায় আসামিরা ভুক্তভোগীদের প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করেন এবং আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।


নিঃস্ব ভুক্তভোগী পরিবারের হাহাকার

ভুক্তভোগী অলিদ বিশ্বাস ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে জানান যে, সরল বিশ্বাসে তিনি, তাঁর পিতা বাদল বিশ্বাস এবং চাচা দেলোয়ার হোসেন পৈত্রিক জমিজমা ও সহায়-সম্বল বিক্রি করে ৩২ লাখ টাকা জোগাড় করেছিলেন। উন্নত ভবিষ্যতের আশায় আসামিদের হাতে সবটুকু সম্পদ তুলে দিয়ে তাঁরা এখন আক্ষরিক অর্থেই নিঃস্ব। অলিদ বলেন, “তারা আমাদের সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে চরম প্রতারণা করেছে। আমরা সব হারিয়ে এখন পথের ফকির।”

আসামিদের অব্যাহত হুমকির মুখে উপায়ান্তর না দেখে ভুক্তভোগীরা স্থানীয়দের সহায়তায় আইনের আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে তাঁরা থানায় যোগাযোগ করলে পুলিশ তাঁদের আদালতের মাধ্যমে মামলা করার পরামর্শ দেয়। সেই মোতাবেক মানিকগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ এ একটি সিআর (CR) মামলা দায়ের করা হয়।


পিবিআই-এর তদন্ত ও আদালতের কঠোর অবস্থান

মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে আদালত এর তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর ওপর ন্যস্ত করেন। পিবিআই দীর্ঘ তদন্ত শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার প্রাথমিক সত্যতা খুঁজে পায় এবং আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত অভিযুক্ত জহিরুল ও মনোয়ারা বেগমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর সোমবার (২৭ এপ্রিল) আসামিরা মানিকগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪ এ উপস্থিত হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন করেন। তবে আদালতের বিচারক মামলার গুরুত্ব এবং পিবিআই-এর প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। বিচারক আসামিদের তাৎক্ষণিকভাবে জেলা হাজতে প্রেরণের নির্দেশ প্রদান করেন।

ভুক্তভোগীদের দাবি ও সামাজিক প্রভাব

আদালতের এই আদেশে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষ। তাঁদের দাবি, কেবল জেলেই নয়, বরং এই প্রতারক চক্রের কাছ থেকে যেন তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি তাঁরা এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো নিরীহ মানুষ বিদেশে যাওয়ার নামে এমন প্রতারণার শিকার না হয়।

মানিকগঞ্জ জেলা আদালত সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আসামিদের মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে গমনেচ্ছু সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং এ ধরনের দ্রুত আইনি পদক্ষেপই পারে প্রতারক চক্রের দাপট রুখে দিতে।