রবিবার শুরু হওয়া এবারের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন মঙ্গলবার পর্যন্ত চলার কথা। এতে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী, চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, উদ্ভাবন এবং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার উপায় নিয়ে সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে আলোচনা হচ্ছে।
এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘সংকট থেকে স্থিতিস্থাপকতা: স্বাস্থ্যের জন্য উদ্ভাবন’। স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান সংকট মোকাবিলা, স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের জরুরি পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে সাড়া দেওয়ার কৌশল নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের মতবিনিময়ের কথা রয়েছে।
সম্মেলনের প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী, মুহাম্মদ ইউনূসের একটি অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। সে অনুযায়ী, সম্মেলনের ওয়েবসাইটে তাঁকে বক্তা হিসেবে তালিকাভুক্তও করা হয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে তাঁর নাম ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সম্মেলনের যোগাযোগ দলের পক্ষ থেকে আনা স্টোরমার এক ইমেইলে জানান, স্বাস্থ্যগত কারণে মুহাম্মদ ইউনূস সম্মেলনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছেন। তাঁর সফর বাতিলের বিষয়ে আয়োজকদের পক্ষ থেকে এই ব্যাখ্যাই দেওয়া হয়েছে।
একই সম্মেলনের একটি অধিবেশনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী এবং জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট চিকিৎসক জোবাইদা রহমানের। সম্মেলনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কর্মসূচিতে তাঁর অংশগ্রহণের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউনূসের অংশগ্রহণ নিয়ে ইউরোপের পাঁচ সংগঠনের আপত্তি
মুহাম্মদ ইউনূসের সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরেই আপত্তি জানিয়ে আসছিল ইউরোপভিত্তিক কয়েকটি সংগঠন। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব এবং জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রায় তিন সপ্তাহ আগে পাঁচটি সংগঠন সম্মেলনে তাঁর অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে একটি পিটিশনও দাখিল করা হয়। এতে সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম, বেলজিয়াম; ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরাম, ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য; ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ ইন জার্মানি; আর্থ সিভিলাইজেশন নেটওয়ার্ক এবং ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস অ্যালায়েন্সের নাম উল্লেখ করা হয়।
পিটিশনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে যেসব প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সেগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। সংগঠনগুলোর বক্তব্য ছিল, এসব অভিযোগ ও প্রশ্ন স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সেই পর্যালোচনা সম্পন্ন হওয়ার আগে মুহাম্মদ ইউনূসকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের বিশেষ বক্তা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
তবে পিটিশনে উত্থাপিত প্রশ্ন বা অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন পর্যালোচনার ফলাফল সম্পর্কে মূল প্রতিবেদনে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। একইভাবে, সম্মেলনে অংশগ্রহণ বাতিলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংগঠনগুলোর আপত্তির কোনো সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন তথ্যও আয়োজকদের বক্তব্যে পাওয়া যায়নি।
জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি নিয়ে সংগঠনগুলোর উদ্বেগ মূলত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ঘিরে। হাম একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বিশেষ করে শিশুদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। টিকাদানের আওতা, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এ ধরনের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ।
জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি, টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেগুলোর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন হয়। তবে কোনো প্রাদুর্ভাবের জন্য নির্দিষ্ট সরকার বা প্রশাসনকে দায়ী করার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য, রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার নথি বিবেচনা করা জরুরি।
বার্লিনের সম্মেলনে মুহাম্মদ ইউনূসের অংশগ্রহণ বাতিলের ঘটনা তাই একদিকে তাঁর সফরসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপে বসবাসরত কয়েকটি সংগঠনের উদ্বেগকে সামনে এনেছে। তবে আয়োজকদের দেওয়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তাঁর অনুপস্থিতির কারণ স্বাস্থ্যগত সমস্যা। পিটিশন বা সংগঠনগুলোর আপত্তি সফর বাতিলের কারণ ছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি।









