খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস সনদ এবং সবুজ বীমা খাতে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুটি খাত কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে দেশটি বছরে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হতে পারে।
Table of Contents
কার্বন নিঃসরণ হ্রাস সনদ এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, যেখানে এক টন কার্বন নিঃসরণ কমালে একটি সনদ পাওয়া যায়। এই সনদ বৈশ্বিক বাজারে বিক্রি করে আয় করা সম্ভব হয়। উন্নত দেশ ও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নির্ধারিত নিঃসরণ সীমা পূরণের জন্য এসব সনদ ক্রয় করে থাকে।
বাংলাদেশ এই খাতে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করে ২০০৬ সালে, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের উদ্যোগে। এরপর থেকে দেশটি প্রায় ২৫ লক্ষ ৩০ হাজার কার্বন সনদ বিক্রি করে প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ মার্কিন ডলার আয় করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আয় দেশের প্রকৃত সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম।
বিশ্বব্যাপী কার্বন সনদের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজারের আকার কয়েক লক্ষ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এতে বাংলাদেশের জন্য অংশগ্রহণ ও আয় বৃদ্ধির বড় সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে দেশে ২৮০টিরও বেশি পরিবেশবান্ধব সনদপ্রাপ্ত কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে বহু কারখানা সর্বোচ্চ মানের সনদ অর্জন করেছে।
বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি পরিবেশবান্ধব কারখানার মধ্যে ৬৯টি বাংলাদেশে অবস্থিত, যা দেশের শিল্পখাতের পরিবেশবান্ধব উৎপাদন সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মান অর্জনের প্রমাণ বহন করে।
সবুজ বীমা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ ঝুঁকি হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং বাজার ঝুঁকির সম্মুখীন হয়।
বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১৩১৫ মেগাওয়াট, যার প্রায় ৭৭ শতাংশ সৌরশক্তি নির্ভর। ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এই বিপুল বিনিয়োগ নিরাপদ রাখতে কার্যকর বীমা কাঠামো প্রয়োজন।
২০২৬ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন সীমান্ত সমন্বয় ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হবে। এই ব্যবস্থায় বেশি কার্বন নিঃসরণকারী পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক ইউরোপীয় বাজারে হওয়ায় এই নীতির প্রভাব দেশের রপ্তানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ হবে। ফলে শিল্প উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজন আরও বাড়বে।
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা | সম্ভাবনা |
|---|---|---|
| কার্বন সনদ থেকে আয় | প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ মার্কিন ডলার | বছরে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার |
| পরিবেশবান্ধব কারখানা | ২৮০টিরও বেশি | আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা |
| নবায়নযোগ্য জ্বালানি ক্ষমতা | ১৩১৫ মেগাওয়াট | সম্প্রসারণ প্রয়োজন |
| ইউরোপীয় শুল্ক ব্যবস্থা | ২০২৬ থেকে কার্যকর | রপ্তানিতে বড় প্রভাব |
এই খাতে সম্ভাবনা থাকলেও কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশে এখনও পূর্ণাঙ্গ জাতীয় কার্বন নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। নীতিমালা ও আইনি কাঠামোও সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কার্বন মূল্যায়ন ও যাচাইয়ের সক্ষম প্রতিষ্ঠান সীমিত।
সবুজ প্রকল্পের জন্য বীমা প্রিমিয়াম নির্ধারণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়নে প্রয়োজনীয় তথ্য ও দক্ষতার অভাবও একটি বড় বাধা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত নীতি প্রণয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা গেলে বাংলাদেশ এই উদীয়মান সবুজ অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান অর্জন করতে পারবে।
মন্তব্য