খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ই জুলাই ২০২৬, ৮:১৭ পিএম

খুলনায় কিশোরী নির্জনা (১৬) হত্যাকাণ্ডে এবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তার বাবা আকাশ। এর আগে একই মামলায় নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সীমাও হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। বাবা-মা দুজনের স্বীকারোক্তির পর বহুল আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
রোববার (১৯ জুলাই) বিকেলে খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এর বিচারক মো. আসাদুর জামানের আদালতে আকাশের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এর আগে শনিবার (১৮ জুলাই) দুপুর আড়াইটার দিকে র্যাব ও খুলনা সদর থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে ডুমুরিয়া উপজেলার একটি বাজারের দোকান থেকে আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ সময় ধরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেই সময় তিনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন এবং পরদিন স্বেচ্ছায় আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
এরও আগে, ১০ জুলাই নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা জানান।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও খুলনা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম জানান, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ জুলাই সকালে নির্জনা তার স্বামী রনির সঙ্গে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নগরীর বসুপাড়া বাঁশতলা এলাকার বাড়ি থেকে বের হন। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে ফিরিয়ে আনেন। ওই দিন বিকেলে নির্জনার সঙ্গে তার মা সীমার তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়, যা একপর্যায়ে শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ঘটনার সময় নির্জনা তার মায়ের গায়ে হাত তোলেন এবং একপর্যায়ে মায়ের গলা চেপে ধরেন। তখন বাবা আকাশ কাঠের একটি টুকরা দিয়ে তাকে শাসন করতে গেলে সেটি নির্জনার মাথায় আঘাত করে। এরপর তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান। তদন্তকারীরা এই বর্ণনাকে অভিযুক্তদের দেওয়া জবানবন্দির অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন এবং অন্যান্য আলামতের সঙ্গে তা যাচাই করছেন।
তদন্তে আরও জানা গেছে, মৃত্যুর পর ঘটনাটি গোপন করার উদ্দেশ্যে নির্জনার মরদেহ কালো রঙের একটি লুঙ্গি দিয়ে বেঁধে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরা হয়। পরে দোতলা থেকে নিচে নামিয়ে মোটরসাইকেলে করে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরানো হয়। কোথায় মরদেহ ফেলে দেওয়া হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় থাকার পর শেষ পর্যন্ত শহরতলির প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার একটি নির্জন সড়কে বস্তাবন্দি মরদেহটি ফেলে দেওয়া হয়। পরে বাড়িতে ফিরে দুজনেই রক্তের দাগ পরিষ্কার করেন। রাতটি বাড়িতেই কাটিয়ে পরদিন সকালে তারা আত্মগোপনে চলে যান।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের পর প্রথমদিকে নিহতের পরিচয় কিংবা হত্যার কারণ সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। পিবিআই ও সিআইডিও শুরুতে পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মরদেহের ছবি প্রকাশ করা হলে পরদিন বিকেলে নির্জনার পরিচয় নিশ্চিত হয়।
তিনি জানান, তদন্তের সময় সবচেয়ে বেশি সন্দেহের সৃষ্টি হয়, যখন নির্জনার মা-বাবার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে বিভিন্ন উপায়ে সীমাকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি প্রথমে নীরব থাকলেও পরে পুরো ঘটনার বর্ণনা দেন। ঘটনার ছয় দিন পর আকাশের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয় এবং হত্যাকাণ্ডের ১০ দিন পর ডুমুরিয়ার একটি চায়ের দোকান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে। জবানবন্দি, আলামত এবং ফরেনসিক তথ্য পর্যালোচনা করে ঘটনার সব দিক যাচাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য