বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ সময়ের সঙ্গে শুধু টিকে থাকে না, বরং সময়কে ছাপিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। সাবিনা ইয়াসমীন সেই বিরল শিল্পীদের একজন। তাঁর কণ্ঠে প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মানুষের জীবনের নানা অনুভূতি পেয়েছে অনন্য প্রকাশ। দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলা সংগীতের ভুবনে সক্রিয় এই কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আজ ৭২ বছরে পা দিলেন।
১৯৫৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন সাবিনা ইয়াসমীন। তাঁর পৈতৃক নিবাস সাতক্ষীরায়। সংগীতের আবহেই কেটেছে তাঁর শৈশব। বাবা লুৎফর রহমান ও মা মৌলুদা খাতুন দুজনেই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাঁচ বোনের মধ্যে চারজনই গান করেছেন—ফরিদা ইয়াসমীন, ফওজিয়া খান, নীলুফার ইয়াসমীন ও সাবিনা ইয়াসমীন। ফলে ছোটবেলা থেকেই গানের পরিবেশ ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী।
গানের প্রতি তাঁর স্বাভাবিক আকর্ষণ খুব অল্প বয়সেই প্রকাশ পায়। বড় বোন ফরিদা ইয়াসমীন যখন ওস্তাদ দুর্গাপ্রসাদ রায়ের কাছে সংগীতের তালিম নিতেন, তখন ছোট্ট সাবিনাও পাশে বসে গান শুনতেন এবং সুর তুলে নেওয়ার চেষ্টা করতেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে অল পাকিস্তান স্কুল সংগীত প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। সাত বছর বয়সে মঞ্চে গান গেয়ে শুরু হয় তাঁর প্রকাশ্য সংগীতযাত্রা। পরবর্তী সময়ে ওস্তাদ পি সি গোমেজের কাছে টানা ১৩ বছর শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেন।
শিশুশিল্পী হিসেবেও চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ শোনা যায়। ১৯৬২ সালে রবীন ঘোষের সুরে ছোটদের জন্য গান গেয়ে সংগীতজগতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করেন তিনি। একই সময়ে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে গান করেন। ১৯৬৭ সালে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রে ‘মধু জোছনা দীপালি’ গানটির মাধ্যমে তাঁর প্লেব্যাক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।
এরপর ১৯৭০ সালে খান আতাউর রহমানের সুরে ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রের ‘একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে’ গানটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। গানটি আজও বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় সংগীত হিসেবে শ্রোতাদের কাছে পরিচিত। এই সময় থেকেই চলচ্চিত্রের গানে সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠ ক্রমে হয়ে ওঠে অপরিহার্য।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের গান, পল্লিগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত ও গজলসহ বিভিন্ন ধারায় গান করেছেন। তাঁর কণ্ঠে ‘সব ক’টা জানালা খুলে দাও না’, ‘মাঝি নাও ছাড়িয়া দে’, ‘সুন্দর সুবর্ণ’, ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার’ এবং ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’-এর মতো গান বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনার সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য গান তাঁর কণ্ঠে নতুন মাত্রা পেয়েছে। চলচ্চিত্রের গানেও তিনি দীর্ঘ সময় ধরে শীর্ষস্থানীয় শিল্পী হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড করা গানের সংখ্যা ১৬ হাজারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে; এর বড় অংশই চলচ্চিত্রের গান।
চলচ্চিত্রের গানে তাঁর অবদানের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতিগুলোর একটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সাবিনা ইয়াসমীন এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী হিসেবে ১৫ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন, যা বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে একটি অনন্য রেকর্ড।
রাষ্ট্রীয় সম্মাননার ক্ষেত্রেও তাঁর অর্জন উল্লেখযোগ্য। সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮৪ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে পান স্বাধীনতা পুরস্কার। ১৯৮৫ সালে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিও অর্জন করেন তিনি। ২০১২ সালে বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলোশিপে ভূষিত হন।
বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়েও সাবিনা ইয়াসমীনের সংগীত পরিবেশনা ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন দেশে। ইংল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, হংকং, যুক্তরাষ্ট্র ও বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে তিনি গান পরিবেশন করেছেন। ভারত ও পাকিস্তানেও তাঁর সংগীত পরিবেশনার নজির রয়েছে। বাংলা ছাড়াও বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি।
উপমহাদেশের খ্যাতিমান শিল্পী ও সুরকারদের সঙ্গেও কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন সাবিনা ইয়াসমীন। আর ডি বর্মণের সুরে গান গাওয়ার পাশাপাশি কিশোর কুমার, মান্না দে, আশা ভোঁসলে, শ্যামল মিত্র, কুমার শানুসহ বহু খ্যাতিমান শিল্পীর সঙ্গে তাঁর কণ্ঠের সমন্বয় ঘটেছে। বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের অসংখ্য সুরকার ও গীতিকারের সৃষ্টিকে তাঁর কণ্ঠ সমৃদ্ধ করেছে।
সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও দেখা গেছে তাঁকে। গাজী মাজহারুল আনোয়ার পরিচালিত ‘উল্কা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। পরে প্রতিভাবান নতুন শিল্পীদের সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন আয়োজনে বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন।
সাবিনা ইয়াসমীনের শিল্পীজীবনে পারিবারিক পরিমণ্ডলের প্রভাবও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তাঁর ভগ্নিপতি খান আতাউর রহমানের সঙ্গে সংগীত ও চলচ্চিত্রের দীর্ঘ সম্পর্ক তাঁর ক্যারিয়ারের নানা পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খান আতাউর রহমান ছিলেন চলচ্চিত্রকার, অভিনেতা, গীতিকার ও সুরকার—বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নাম।
দীর্ঘ সংগীতজীবনের পরও সাবিনা ইয়াসমীনের গাওয়া গান নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত। সময়ের সঙ্গে সংগীতের ধরন বদলেছে, শ্রোতার রুচিতেও এসেছে পরিবর্তন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে ধারণ করা বহু গান এখনও বিভিন্ন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়। এটাই তাঁর শিল্পীসত্তার স্থায়িত্বের বড় প্রমাণ।
২০২০ সালে প্রয়াত কবরী পরিচালিত ‘এই তুমি সেই তুমি’ চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি চারটি গানে প্রথমবারের মতো সুরকার হিসেবেও কাজ করেন সাবিনা ইয়াসমীন।
১৯৫৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর যে শিশুটির কণ্ঠ সংগীতের পথে যাত্রা শুরু করেছিল, সাত দশকেরও বেশি সময় পর সেই কণ্ঠ আজ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর গাওয়া গান শুধু বিনোদনের উপকরণ হয়ে থাকেনি; সময়ের নানা বাঁকে মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।
আজ তাঁর ৭২তম জন্মদিন। এই দিনটি তাই কেবল একজন শিল্পীর জন্মদিন নয়, বাংলা গানের দীর্ঘ এক সমৃদ্ধ অধ্যায়েরও স্মরণীয় দিন। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে যে শিল্পী তাঁর কণ্ঠ দিয়ে শ্রোতাদের সমৃদ্ধ করেছেন, জন্মদিনে সেই কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পীর প্রতি রইল শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা।










