১৯৮১ সালে প্রকাশিত আহমদ সফার প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে এক তুলনারহিত প্রশংসাধন্য টেক্সট হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। বহু দশক ধরে সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক সমালোচকরা দাবি করে এসেছেন—এই গ্রন্থে সফা বাঙালি মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়ের সংকট ও গোঁড়ামির এমন এক নির্মোহ ‘আত্মসমালোচনা’ হাজির করেছেন, যা আর কেউ করতে পারেনি। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে গভীরভাবে পাঠ করলে দেখা যায়, এই বহুল প্রশংসিত ‘আত্মসমালোচনা’র গায়ে জড়ানো রয়েছে একটি চরম প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক চাদর।
ছফা এখানে সমাজকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন কোনো মার্কসীয় বা ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে নয়; বরং তিনি আশ্রয় নিয়েছেন একপ্রকার আদর্শবাদী জাদুটোনার (Idealist Determinism)। যেখানে শ্রেণি, জমিদারি প্রথা, উৎপাদন সম্পর্ক এবং ঔপনিবেশিক অর্থনীতির বস্তুগত প্রভাবকে গৌণ করে দিয়ে ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ ও ‘পৃথক মনস্তাত্ত্বিক সত্তা’কে ইতিহাসের চালিকাশক্তি বানানো হয়েছে। বাহ্যিক আত্মসমালোচনার আড়ালে সফা মূলত “বাঙালি মুসলমান”কে এক অপরিবর্তনশীল, অবরুদ্ধ এবং পৃথক সাম্প্রদায়িক মানস হিসেবে নির্মাণ করেছেন, যা অসাম্প্রদায়িক নাগরিক সমাজ গঠনের মূল ভিত্তিকে ধসিয়ে দেয়।
১. মার্কসীয় শ্রেণিবিশ্লেষণের হত্যা: অর্থনৈতিক কাঠামোর স্থানে ‘ধর্মীয় মনস্তত্ত্ব’
সমাজবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়ম হলো—মানুষের সামাজিক চেতনা তার অস্তিত্ব নির্ধারণ করে না, বরং মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্তিত্বই তার চেতনাকে রূপ দান করে। ১৮ শতকের শেষভাগে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) থেকে শুরু করে ২০ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত বাংলায় যে সামাজিক মেরুকরণ ঘটেছিল, তার মূলে ছিল ঔপনিবেশিক ভূ-সম্পত্তি আইন এবং সামন্তীয় শোষণ।
কৃষকের ওপর জমিদারের নিপীড়ন, জোতদারদের খাজনা আদায়, কিংবা সুদের কারবার—এগুলোর প্রধান পরিচয় ছিল ‘শ্রেণিগত’। পূর্ব বাংলার লাখ লাখ হিন্দু-মুসলিম প্রজা একই বস্তুগত শোষণের শিকার হয়েছিল। কিন্তু সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে এই বস্তুধর্মী সমাজতত্ত্বকে একঝটকায় মুছে ফেলে ধর্মীয় মনস্তত্ত্বকে ইতিহাস নিয়ন্ত্রক হিসেবে খাড়া করেছেন।
“বাঙালি মুসলমানের মন বলে যদি সত্যি কিছু থেকে থাকে, তবে তার প্রধান লক্ষণ হলো—তা কোনো কালেই এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকেনি। বাঙালি মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটেনি, কারণ তা সর্বদাই একপ্রকারের অবরুদ্ধ মানসিকতার ভেতর বন্দী হয়ে ছিল।”
কথাটিকে আপাতদৃষ্টিতে খুব কঠোর আত্মসমালোচনা মনে হলেও, এর পেছনে লুকানো তাত্ত্বিক ফাঁদটি মারাত্মক:
- কারণ ও ফলাফলের বিপরীত উপস্থাপন: বাঙালি মুসলিমের অনগ্রসরতা কেন ঘটেছিল? বস্তুবাদী ব্যাখ্যা বলে—শিক্ষার সুযোগের অভাব, প্রশাসনিক বৈষম্য, পুঁজির অভাব ও ঔপনিবেশিক নীতি ছিল এর মূল কারণ। কিন্তু সফা কারণ বানিয়ে দিলেন “মনস্তাত্ত্বিক অবরুদ্ধতা”কে। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার ফসলকে তিনি বানিয়ে দিলেন অনগ্রসরতার মূল ‘কারণ’।
- শ্রেণিচেতনার গুম: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে যে হিন্দু জমিদার ও মুসলিম/নিম্নবর্ণের হিন্দু প্রজার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা ছিল অর্থনৈতিক শ্রেণিসংগ্রাম। সফা সেই অর্থনৈতিক সম্পর্ককে রূপ দিলেন এক চিরন্তন ‘ধর্মীয় দ্বন্দ্বে’। এর ফলে জমিদারদের শ্রেণিশোষণ আড়াল পেয়ে গেল, আর প্রজা-কৃষক সমাজ সচেতন হলো কেবল তাদের ‘মুসলিম পরিচয়’ নিয়ে।
২. এসেনশিয়ালিজম (Essentialism) ও ‘আশরাফ-আতরাফ’ বৈষম্য ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল
‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে ছফা একটি মারাত্মক সমাজতাত্ত্বিক অপরাধ করেছেন—তিনি “বাঙালি মুসলমান” নামক এক স্থির ও একক (Monolithic) সত্তা কল্পনা করে নিয়েছেন। সমাজতাত্ত্বিক পরিভাষায় একে বলা হয় সত্তাভিত্তিক এসেনশিয়ালিজম।
একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভেতরে অঞ্চল, বর্ণ, অর্থনৈতিক অবস্থান ও শ্রেণির ভিত্তিতে হাজারো বিভাজন থাকে। ১৯ শতক ও ২০ শতকের সূচনায় বাঙালি মুসলিম সমাজ তীব্রভাবে বিভক্ত ছিল দুই ভাগে:
১. আশরাফ (উচ্চবিত্ত সামন্ত ও উর্দুভাষী এলিট): যারা সাধারণ বাঙালি মুসলিমকে পদাঘাত করত, বাংলায় কথা বলাকে ‘কাফেরী’ মনে করত এবং ঔপনিবেশিকদের অনুগৃহীত হয়ে জমিদারি ভোগ করত।
২. আতরাফ (বাঙালিভাষী কৃষক, কারিগর ও মেহনতি মানুষ): যারা শত শত বছর ধরে এই ভূখণ্ডের মাটির সাথে যুক্ত ছিল।
ছফা তাঁর বিশ্লেষণে এই অভ্যন্তরীণ শ্রেণীগত শোষণ ও ‘আশরাফদের’ প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা নিয়ে কাঠামোগত যুদ্ধ ঘোষণা করার বদলে, সকল স্তরকে মিলিয়ে-মিশিয়ে ‘বাঙালি মুসলমানের মানস’ নামক এক কাল্পনিক পাত্রে ঢেলে দিয়েছেন।
ছফা লিখছেন:
“বাঙালি মুসলমান সমাজের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এ সমাজটি মূলত একটি বিশাল কৃষক সমাজ। এই কৃষক সমাজের মানস কাঠামোটি গঠিত হয়েছে ধর্মীয় সংস্কার এবং রূপকথার সংমিশ্রণে।”
এখানেই ছফীয় দর্শনের চাতুরি। একটি গোটা বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যাকে কেবল “ধর্মীয় রূপকথায় বিশ্বাসী কৃষক মানস” হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে তিনি তাদের অভ্যন্তরীণ শ্রেণি সংগ্রামকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। উচ্চবিত্ত মুসলিম শোষকদের পাপকে তিনি ঢাকা দিয়েছেন এক অখণ্ড “মুসলিম ভাই ভাই” পরিচয়ের নিচে।
[ছফীয় ইতিহাসের বিকৃতি চক্র]
সামন্তীয় ও ঔপনিবেশিক শ্রেণিশোষণ (বাস্তবতা)
↓
শ্রেণি বিশ্লেষণকে খারিজ করে 'ধর্মীয় মনস্তত্ত্ব'কে ইতিহাস নিয়ন্ত্রক করা
↓
বাঙালি মুসলিমকে 'চিরন্তন অবরুদ্ধ মানস' হিসেবে সাব্যস্ত করা
↓
অভ্যন্তরীণ আশরাফ-আতরাফ শ্রেণিসংগ্রাম আড়াল করে অখণ্ড ধর্মীয় পরিচয় গঠন
↓
ধর্মনিরপেক্ষ শ্রেণিসংগ্রামের বদলে 'সাম্প্রদায়িক স্বাতন্ত্র্যবাদের' বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠা
৩. ঐতিহাসিক ভুক্তভোগী (Victimhood) চেতনা ও হিন্দু বিদ্বেষের মনস্তাত্ত্বিক বৈধায়ন
ছফা যখন দাবি করেন যে তিনি বাঙালি মুসলমানের দুর্বলতা উন্মোচন করছেন, তখন তিনি অতি সূক্ষ্মভাবে সমস্ত দোষের দায় চাপিয়ে দেন হিন্দু সমাজের ওপর। তিনি এমন একটি ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করেন যেন বাঙালি মুসলিম মানস যে ‘সংকীর্ণ’ হয়ে রইল, তার পেছনে প্রধান অনুঘটক ছিল হিন্দু সমাজের “প্রত্যাখ্যান”।
গ্রন্থের এক জায়গায় ছফা উল্লেখ করছেন:
“বাঙালি মুসলমান হিন্দু সমাজের পাশাপাশি বাস করে এসেছে, কিন্তু হিন্দু সংস্কৃতি তাকে কখনো গ্রহণ করেনি। হিন্দু সমাজ বাঙালি মুসলমানকে সর্বদাই একটি বহিরাগত উপাদান হিসেবে দেখে এসেছে।”
এই যুক্তির মাধ্যমে সফা কী প্রতিষ্ঠা করলেন?
১. তিনি দেখালেন, বাঙালি মুসলিমের কোনো নিজস্ব সক্রিয়তা (Agency) ছিল না; সে যা কিছু হয়েছে, তা কেবল হিন্দু সমাজের প্রতি ‘প্রতিক্রিয়া’ জানাতে গিয়ে হয়েছে।
২. তিনি বাঙালি মুসলিমদের মনে এই বিপজ্জনক বিষ ঢুকিয়ে দিলেন যে—আমরা যতোই প্রগতিশীল হতে চাই না কেন, ‘হিন্দু সমাজ’ বা ‘সেক্যুলাররা’ আমাদের কখনো গ্রহণ করবে না। সুতরাং আমাদের একমাত্র রক্ষা কবচ হলো নিজস্ব ‘ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদ’।
এটি কোনো আত্মসমালোচনা নয়; এটি হলো চরমপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যবহৃত ‘ভিকটিমহুড কার্ড’ (Victimhood Card)। ইতিহাসের কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক দূরত্বকে যদি একটি সম্প্রদায়ের অখণ্ড আত্মপরিচয়ে রূপান্তর করা হয়, তবে তা মুক্তির পথ দেখায় না; তা জন্ম দেয় গভীর সাম্প্রদায়িক ক্ষোভ ও উগ্র স্বাতন্ত্র্যবাদ।
৪. প্রগতির ছদ্মবেশে প্রতিক্রিয়াশীলতার বিজয়
আহমদ সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে প্রগতিশীল পরিভাষা—যেমন ‘বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি’, ‘আধুনিকতা’, ‘ইতিহাস সচেতনতা’—ইত্যাদি প্রচুর ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো প্রগতিশীলতার ঠিক বিপরীত মেরুতে গিয়ে ঠেকেছে।
যদি কোনো সমাজতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত দেয় যে, একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে পরিচালনা করে তাদের ‘ধর্মীয় মন’, এবং সেই মন চিরকালই অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে পৃথক ও বিচ্ছিন্ন—তবে সেই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক পরিণতি কী হতে পারে? এর রাজনৈতিক পরিণতি মাত্র একটিই: দ্বিজাতিতত্ত্ব বা সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে বুদ্ধিবৃত্তিক জাস্টিফায়ার বা সাফাই দান করা।
সফা এই গ্রন্থে বাঙালি মুসলিমকে এমন একটি মানস-ফ্রেমের ভেতরে বন্দী করে ফেলেছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার একমাত্র রাস্তা হলো ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদী রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করা। তিনি প্রগতিশীল বামপন্থী বা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে এই বার্তা দিয়েছেন যে—“তোমাদের শ্রেণিসংগ্রাম বা সেক্যুলারিজম দিয়ে এই বাঙালি মুসলমানকে টানা যাবে না, কারণ এদের মনটাই হলো ধর্মীয়।”
‘বাঙালি মুসলমানের মন’: ডানপন্থার তাত্ত্বিক ম্যানিফেস্টো
সুতরাং, আহমদ সফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ কোনো বৈপ্লবিক প্রগতিশীল বা অসাম্প্রদায়িক সাহিত্যকর্ম নয়। এটি প্রগতির আধুনিক ভাষা ব্যবহার করে লেখা এমন এক সাম্প্রদায়িক স্বাতন্ত্র্যবাদের তাত্ত্বিক ম্যানিফেস্টো, যা সমাজবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক পাঠকে বাতিল করে ধর্মীয় পরিচয়নীতিকে পরম সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সমাজতত্ত্বের চরম দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পায় তখনই, যখন বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক উৎপাদন সম্পর্ককে দূরে ঠেলে ‘ধর্মীয় মনস্তত্ত্ব’কে ইতিহাসের চালক হিসেবে উপাসনা করা হয়। সফা ঠিক এই দেউলিয়াত্বের চূড়ায় বসে বাঙালি মুসলমানকে এক অবরুদ্ধ ধর্মীয় বাক্সে বন্দী করে গেছেন।
আর ঠিক এই কারণেই, আজকের বাংলাদেশে যারা উগ্র ডানপন্থী, যারা ধর্মীয় উগ্রতাকে “জনগণের প্রাক-রাজনৈতিক ক্ষোভ” বলে চালাতে চায় এবং যারা অসাম্প্রদায়িক নাগরিক রাষ্ট্রকে ভেঙে “মুসলিম পরিচয়ভিত্তিক রাজ্য” গড়তে চায়—তাদের সবার হাতের প্রথম পাঠ্যবই হয়ে উঠেছে আহমদ সফার এই বিষাক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক ম্যানিফেস্টো।







