বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন এবং দীর্ঘস্থায়ী ম্যাচের সাক্ষী হলো বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) গুরুত্বপূর্ণ এক ম্যাচে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস ও বাংলাদেশ পুলিশ এফসির মধ্যকার লড়াইটি ১৬৮ মিনিট পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়। নিয়মের গ্যাঁড়াকলে প্রায় ৭৫ মিনিট খেলা বন্ধ থাকার পর শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলের সমতায় ম্যাচটি শেষ হয়েছে। এই ড্রয়ের ফলে লিগ টেবিলের শীর্ষে থাকা কিংসের সাথে দ্বিতীয় স্থানে থাকা আবাহনী লিমিটেডের পয়েন্ট ব্যবধান কমে আসায় শিরোপা নির্ধারণী সমীকরণ এখন অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Table of Contents
ম্যাচের গতিপ্রকৃতি ও প্রাথমিক আধিপত্য
বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় ম্যাচের শুরু থেকেই স্বাগতিক কিংস আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। ম্যাচের ৩৫ মিনিটে বসুন্ধরা কিংসের ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড দরিয়েলতন গোমেজ গোল করে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। প্রথমার্ধের খেলা শেষে এই লিড বজায় থাকায় কিংসের জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল মনে হচ্ছিল। তবে বিরতির ঠিক পরপরই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে পুলিশ এফসির ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় পাওলো হেনরিখ গোল করে দলকে ১-১ সমতায় ফেরান।
বাইলজ বিতর্ক ও দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা
ম্যাচের ৬৩ মিনিটে ঘটে এক নাটকীয় ঘটনা। বলের দখল নিতে গিয়ে বসুন্ধরা কিংসের ফয়সাল আহমেদ ফাহিমকে ধাক্কা দেন পুলিশের পাওলো হেনরিখ। রেফারি তাকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখালে লাল কার্ড পেয়ে তিনি মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। এই ঘটনার পরই শুরু হয় মূল জটিলতা। পুলিশ এফসির কোচিং স্টাফ একজন দেশীয় ফুটবলারকে তুলে নিয়ে তার পরিবর্তে একজন বিদেশি খেলোয়াড় নামাতে চান।
তবে বাংলাদেশ ফুটবল লিগের বাইলজ বা উপ-আইনের ২৭.১ ধারা অনুযায়ী, মাঠে একজন বিদেশি খেলোয়াড়ের পরিবর্তে কেবলমাত্র আরেকজন বিদেশি খেলোয়াড়ই বদলি হিসেবে নামতে পারবেন। লাল কার্ডের কারণে একজন বিদেশি কমে যাওয়ায় পুলিশের দাবি ছিল তারা কৌশলগত কারণে অন্য একজন স্থানীয় খেলোয়াড়ের বদলে বিদেশি নামাবে, যা নিয়মের পরিপন্থী। এই নিয়ম মানতে পুলিশ এফসির কোচিং স্টাফ অসম্মতি জানালে রেফারি, ম্যাচ কমিশনার এবং ক্লাব কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘ দেনদরবার শুরু হয়। এর ফলে প্রায় ৭৫ মিনিট খেলা বন্ধ থাকে এবং ফুটবলাররা মাঠেই অপেক্ষায় থাকেন। শেষ পর্যন্ত বাইলজের নিয়ম মেনেই খেলা পুনরায় শুরু করতে রাজি হয় পুলিশ।
১০ জনের লড়াই ও ড্রয়ের পরিণতি
দীর্ঘ বিরতির পর ম্যাচ পুনরায় শুরু হলে নষ্ট হওয়া সময়ের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২৭ মিনিট অতিরিক্ত সময় (ইনজুরি টাইম) যোগ করা হয়। ঘড়ির কাঁটায় তখন ম্যাচটি ১৬৮ মিনিটে পৌঁছায়। প্রতিপক্ষের একজন খেলোয়াড় কম থাকার সুবিধা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয় বসুন্ধরা কিংস। উল্টো ম্যাচের শেষ দিকে কিংসের রিমন হোসেন লাল কার্ড দেখলে দুই দলই ১০ জনের দলে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো দলই আর গোল করতে না পারায় ১-১ সমতায় পয়েন্ট ভাগাভাগি করে মাঠ ছাড়ে তারা।
লিগ টেবিলের সমীকরণ ও শিরোপা যুদ্ধ
বসুন্ধরা কিংসের এই হোঁচটে লিগ শিরোপার লড়াই নতুন মাত্রা পেয়েছে। বর্তমানে ১৬ ম্যাচ শেষে ৩৪ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বসুন্ধরা কিংস। অন্যদিকে, দিনের অন্য ম্যাচে গাজীপুরে পিডব্লিউডি স্পোর্টিং ক্লাবকে ২-০ গোলে পরাজিত করেছে আবাহনী লিমিটেড। এই জয়ের ফলে ১৬ ম্যাচে ৩৩ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে তারা।
লিগের বাকি আর মাত্র দুই রাউন্ড। আগামী শুক্রবার কুমিল্লায় লিগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি হবে বসুন্ধরা কিংস ও আবাহনী লিমিটেড। এই ম্যাচের ফলাফলই মূলত নির্ধারণ করে দেবে ২০২৬ মৌসুমের শিরোপা কার ঘরে যাবে। উল্লেখ্য যে, লিগের দ্বিতীয় পর্বে আবাহনী লিমিটেড এখনো অপরাজিত রয়েছে। মারুফুল হকের অধীনে তারা টানা সাতটি ম্যাচে জয়লাভ করে কিংসের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।
ফর্টিস এফসির বিশাল জয়
দিনের অপর ম্যাচে ফকিরেরপুল ইয়ং মেনস ক্লাবের বিপক্ষে গোল উৎসবে মেতে ওঠে ফর্টিস এফসি। তারা ৭-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করে। ফর্টিস এফসির হয়ে পা ওমর বাবু একাই চার গোল করেন এবং ওকাফোর করেন জোড়া গোল। এই জয়ের পর ১৬ ম্যাচে ৩১ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তৃতীয় স্থানে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে ফর্টিস এফসি। শিরোপার দৌড়ে কিংস ও আবাহনী এগিয়ে থাকলেও তৃতীয় স্থানের লড়াইয়ে ফর্টিস তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছে।
সামগ্রিকভাবে, পুলিশের সাথে কিংসের এই ড্র এবং আবাহনীর টানা জয় ঘরোয়া ফুটবলের শীর্ষ আসরকে এক রোমাঞ্চকর পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ১৬৮ মিনিটের সেই দীর্ঘ ম্যাচটি কেবল পয়েন্ট ভাগাভাগিই নয়, বরং লিগ বাইলজের প্রয়োগ এবং মাঠের শৃঙ্খলা নিয়েও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।