,

বগাকে ঘিরে নগর ভবনে অভিযান, ওসি বদল

চট্টগ্রাম নগরের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পুলিশের খাতায় পরিচিত ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে পুলিশের অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে চালানো ওই অভিযানে বগাকে পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাস্থলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাদের বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। পরে প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে অভিযান গুটিয়ে নেয় পুলিশ।

মেয়র শাহাদাত হোসেন অবশ্য বগাকে সন্ত্রাসী হিসেবে মানতে নারাজ। তাঁর দাবি, ওয়াকিল হোসেন সন্ত্রাসী নন; তিনি জুলাইয়ের আন্দোলনের একজন যোদ্ধা। এমনকি বগা নগর ভবনে এসেছিলেন—এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।

বগা চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি মেয়র শাহাদাতের অনুসারী হিসেবেও পরিচিত। পুলিশ বলছে, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে পাওয়া অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতেই মঙ্গলবার রাতে নগর ভবন এলাকায় অভিযান চালানো হয়।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ৯টার দিকে পুলিশ নগর ভবন এলাকায় যায়। পরে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে বগাকে খোঁজা হয়। একপর্যায়ে মেয়রের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। খবর পেয়ে সিএমপির উত্তর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোস্তফা স্বপন ঘটনাস্থলে যান। পরে পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে বগাকে না পেয়ে সেখান থেকে চলে যায়।

সিএমপির সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে বগা ওই এলাকায় অবস্থান করছেন—এমন তথ্য পাওয়ার পর পুলিশের একটি দল সেখানে যায়। কিন্তু তাঁকে পাওয়া যায়নি। ওই সময় তিনি সত্যিই নগর ভবনের ভেতরে ছিলেন কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পুলিশের এই বক্তব্যের সঙ্গে মেয়রের অবস্থানের মূল পার্থক্য এখানেই। মেয়র বলছেন, বগা নগর ভবনে ছিলেন না এবং তাঁকে সেখানে দেখা যাওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, অবস্থান নিশ্চিত না হয়েই কেন নগর ভবনে অভিযান চালানো হলো এবং অভিযানের সময় মেয়র কেন পুলিশের সঙ্গে বিরোধে জড়ালেন।

মেয়রের অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য

ঘটনার পরদিন বুধবার সকালে নগরের ২৫ নম্বর রামপুরা ওয়ার্ডে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মেয়র শাহাদাত হোসেন। সেখানে তিনি শুধু বগাকে নিয়ে পুলিশের বক্তব্যের বিরোধিতা করেননি, খুলশী থানার ওসি মো. আবদুর রহিমের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ তোলেন।

মেয়রের দাবি, গণঅভ্যুত্থানের পর আবদুর রহিম খুলশী থানায় দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত গ্রেপ্তার অভিযান হয়নি। একই সঙ্গে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সম্প্রতি হৃদয় নামের এক তরুণের হত্যা মামলায় কামরুল নামে একজনকে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গও তোলেন মেয়র। তাঁর ভাষ্য, কামরুলকে মারধর করে ওয়াকিল ও তাঁর ভাইদের নাম বলতে বাধ্য করা হয়েছে বলে বগার দুই ভাই তাঁর কাছে অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, নির্যাতনের মাধ্যমে কামরুলের কাছ থেকে ওই নাম নেওয়া হয়েছে এবং পরে তাঁদের বিরুদ্ধেও মামলা দেওয়া হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক কোনো বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই ও ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বক্তব্যের পরই ওসি বদলি

মেয়রের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খুলশী থানার ওসি মো. আবদুর রহিমকে বদলি করা হয়। বুধবার সন্ধ্যায় সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী স্বাক্ষরিত আদেশে এ রদবদলের কথা জানানো হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেন সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী।

আদেশ অনুযায়ী, আবদুর রহিমকে খুলশী থানা থেকে সিটিএসবিতে বদলি করা হয়েছে। আকবরশাহ থানার ওসি মো. কামরুজ্জামানকে খুলশী থানার নতুন ওসি করা হয়েছে। একই আদেশে চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজের হোসেনকে আকবরশাহ থানার ওসি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।

আদেশে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে। খুলশী থানায় দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক মাস ১০ দিনের মাথায় বদলি হলেন আবদুর রহিম।

ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় নতুন আলোচনা

নগর ভবনে অভিযানের সময় মেয়রের উপস্থিতি এবং পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি ভিডিওতে মেয়রকে সাংবাদিকদের উদ্দেশে নগর ভবনে পুলিশের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শোনা যায়। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনে বিভিন্ন কাজে বহু মানুষ আসতে পারেন; পুলিশ কেন সেখানে এসেছে, তা জানতে চান তিনি।

ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক বাধার মুখে পড়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সাংবাদিকের দাবি, পুলিশ নগর ভবন থেকে বের হওয়ার সময় মেয়রের অনুসারীদের সঙ্গে তাঁদের ধাক্কাধাক্কি হয়। কারও কারও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।

এ ঘটনায় নগর ভবনে পুলিশের অভিযান কতটা যৌক্তিক ছিল, সেটি যেমন আলোচনায় এসেছে, তেমনি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে মেয়রের পুলিশের অভিযানে হস্তক্ষেপের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে মেয়রের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ যে ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়েছিল, তিনি আদৌ নগর ভবনে ছিলেন কি না—সেটিও স্পষ্ট নয়।

বগাকে ঘিরে দুই ধরনের দাবি

ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে নিয়ে পুলিশ ও মেয়রের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। পুলিশের খাতায় তিনি সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে মেয়র শাহাদাত তাঁকে সন্ত্রাসী না বলে জুলাইয়ের আন্দোলনের একজন যোদ্ধা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এখন পর্যন্ত নগর ভবনে বগার উপস্থিতির বিষয়ে পুলিশের হাতে থাকা প্রযুক্তিগত তথ্যের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। একইভাবে, মেয়রের দাবি অনুযায়ী তিনি ওই রাতে সেখানে ছিলেন না—এ দাবিরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য সামনে আসেনি।

ফলে ঘটনার তিনটি দিক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—বগার প্রকৃত অবস্থান, তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশের কাছে থাকা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং অভিযানের সময় মেয়রের সঙ্গে পুলিশের বিরোধের কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খুলশী থানার ওসি বদলির বিষয়টি।

সব মিলিয়ে, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে নগর ভবনে পুলিশের অভিযান এখন চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে বগার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ, তাঁর নগর ভবনে উপস্থিতি, পুলিশি অভিযানের পরিস্থিতি এবং মেয়রের তোলা অভিযোগ—কোনোটিরই চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হয়নি। এসব বিষয়ে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ায় যে তথ্য সামনে আসবে, সেটিই শেষ পর্যন্ত ঘটনার প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার করতে পারে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।