‘আমাকে যদি মেরেই ফেলেন, লাশটা অন্তত আমার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েন।’—ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আনিসুজ্জামান জামানের মুখে এই কথাগুলো যেন তাঁর ওপর চালানো নির্যাতনের ভয়াবহতাই তুলে ধরছিল। গতকাল বুধবার নিজের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার কেঁদে ফেলছিলেন তিনি। জামানের অভিযোগ, চাকরি দেওয়ার কথা বলে তাঁকে ডেকে নিয়ে আটকে রাখে কয়েকজন। পরে তাঁর পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না পেয়ে লোহার পাইপ দিয়ে পিটিয়ে তাঁর ডান পা ভেঙে দেওয়া হয়। মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে দিতে হয়েছে সাতটি সেলাই।
জামানের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামে। তিনি প্রয়াত জয়নাল আবেদীনের ছেলে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, আর্থিক সংকটের মধ্যেও একটি চাকরির আশায় তিনি বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছিলেন।
জামানের বর্ণনা অনুযায়ী, গত সোমবার সকালে চাকরির বিষয়ে কথা বলতে তিনি মুক্তাগাছার রসুলপুর এলাকায় যান। সেখানে চার ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে এসে তাঁর কাছে আসেন। একপর্যায়ে তাঁরা জামানের দুই হাত ধরে নাকের কাছে টিস্যুর মতো একটি বস্তু ধরেন। এরপর কী ঘটেছে, সে বিষয়ে আর কিছু মনে নেই তাঁর।
দুপুর সাড়ে দুইটার দিকে জ্ঞান ফেরার পর জামান দেখতে পান, ধলেশ্বরী নদীর পাড়ের একটি খোলা জায়গায় তিনি পড়ে আছেন এবং কয়েকজন তাঁকে মারধর করছে। পরে তাঁকে দিয়ে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলানো হয়। ফোনে তাঁর মায়ের কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে জানান জামান।
কিন্তু পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার মতো সামর্থ্য তাঁর পরিবারের ছিল না। জামানের মা জাহানারা বেগম দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত। তাঁর চিকিৎসার খরচ চালাতেই পরিবারটি আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত। ছেলেকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত তিনি পাঁচ হাজার টাকা সংগ্রহ করে পাঠান। জামানের অভিযোগ, ওই টাকা পাওয়ার পরও তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি।
নির্যাতনের একপর্যায়ে আবারও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন জামান। রাত প্রায় ৯টার দিকে জ্ঞান ফিরলে তিনি নিজেকে অসহায় অবস্থায় দেখতে পান। শরীরের যন্ত্রণার মধ্যেই হামাগুড়ি দিয়ে কোনোভাবে সড়কের কাছে ওঠেন। এরপর চিৎকার করে সাহায্য চাইতে থাকেন। তাঁর চিৎকার শুনে পথচারীরা এগিয়ে এসে তাঁকে উদ্ধার করেন।
রাত আড়াইটার দিকে জামানের বড় বোন বদরুন্নেসা সালমা তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁর আহত পা ও মাথার আঘাতের চিকিৎসা দিচ্ছেন।
জামানের বড় বোন বদরুন্নেসা সালমা বলেন, তাঁর ভাই খুবই সহজ-সরল মানুষ। চাকরির কথা বলেই তাঁকে বাইরে ডেকে নেওয়া হয়েছিল বলে তাঁদের ধারণা। পরে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়ার পরও তাঁকে ছেড়ে না দিয়ে মারধর করা হয়েছে। এতে তাঁর ডান পা ভেঙে গেছে এবং মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে।
পরিবারটির আর্থিক অবস্থাও ভালো নয় জানিয়ে সালমা বলেন, এই অবস্থায় ভাইয়ের চিকিৎসার ব্যয় বহন করাও তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
ছেলের ওপর নির্যাতনের খবর শুনে ভেঙে পড়েছেন জামানের মা জাহানারা বেগম। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, বাড়িতে জামানই তাঁর দেখাশোনা করেন। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ক্যান্সারের চিকিৎসা চালাতে গিয়ে তাঁদের পরিবার প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ছেলেকে এভাবে তুলে নিয়ে নির্যাতনের ঘটনায় তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
জাহানারা বেগম বলেন, ‘আমার আলাভোলা ছেলেটাকে যারা তুলে নিয়ে নির্যাতন করেছে, আল্লাহ যেন তাদের বিচার করেন।’
চাকরির প্রলোভনে কাউকে ডেকে নিয়ে আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি এবং মারধরের অভিযোগ গুরুতর। বিশেষ করে চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণা বা অপরাধের অভিযোগ উঠলে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা জরুরি। তবে জামানের অভিযোগের পেছনে কারা রয়েছে, তাঁকে কোথায় এবং কীভাবে আটকে রাখা হয়েছিল, কিংবা ঘটনার সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে।
ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজ্জাদ রোমন জানান, পুলিশ পাঠিয়ে ঘটনার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয় বা গ্রেপ্তারের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা, হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং জামানকে আটকে রাখার স্থানসহ ঘটনার অন্যান্য দিক স্পষ্ট হওয়ার কথা।









