জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৩২ পিএম

চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের জিয়াশিং শহরে ঘটেছে এক বিষাদময় অথচ বিস্ময়কর ঘটনা। প্রেমিক কতৃক রাতে ঘরে তালাবন্ধ হয়ে অবরুদ্ধ থাকার পর চরম মানসিক যন্ত্রণা সইতে না পেরে ১৮ তলার ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে নিচে লাফ দেন ২০ বছরের এক তরুণী। অত উঁচু থেকে নিচে পড়েও প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়ালে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন তিনি। নিচে থাকা একটি গাছের ঘন ডালপালা তার পতনের প্রচণ্ড গতি ও ধাক্কা অনেকটাই শুষে নেয়। সেখান থেকে পাশেই একটি নরম ঝোপের ওপর আছড়ে পড়েন তিনি।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তরুণীর জীবনের মর্মান্তিক করুণ চিত্র। গত ১২ জুলাই ভোর সাড়ে চারটার দিকে ভয়াবহ এই ঘটনাটি ঘটে। তরুণীর সুরক্ষার কথা ভেবে তার আসল নাম গোপন রেখে ‘শিয়াওই’ ছদ্মনামে তাকে চিহ্নিত করা হয়। শিয়াওইয়ের পরিবারের সদস্যরা জানান, বেশ কিছুদিন ধরেই প্রেমিক কর্তৃক মানসিক ও শারীরিকভাবে নিপীড়নের শিকার হচ্ছিলেন তিনি। এই বিষাক্ত ও যন্ত্রণাদায়ক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন শিয়াওই। অবশেষে প্রেমিককে ছেড়ে নিজের জন্মস্থান ইউনান প্রদেশে ফিরে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। সেই উদ্দেশ্যে ১০ জুলাইয়ের একটি ট্রেনের টিকিটও কেটেছিলেন তিনি। তবে তার প্রেমিক কোনোভাবেই তাকে চলে যেতে দিতে রাজি ছিলেন না।
ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ১১ জুলাই রাতে শিয়াওই যখন ব্যাগ গুছিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তাদের মধ্যে তীব্র বিবাদ শুরু হয়। শিয়াওই যাতে কোনোভাবেই অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে যেতে না পারেন, সে জন্য তার প্রেমিক এক কঠোর ও নির্মম পথ বেছে নেন। তিনি শিয়াওইয়ের মোবাইল ফোন ও জাতীয় পরিচয়পত্র জোরপূর্বক কেড়ে নেন এবং ফ্ল্যাটের মূল দরজায় বাইর থেকে তালা ঝুলিয়ে তাকে গৃহবন্দী করে রাখেন। বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং তালাবদ্ধ ঘরে তীব্র মানসিক চাপ, ভয় ও ক্ষোভ সামলাতে না পেরে শিয়াওই বারান্দা থেকে নিচে লাফ দেওয়ার মতো চরম ও মরিয়া সিদ্ধান্ত নেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল যেকোনো উপায়ে ওই বন্দিদশা থেকে নিজেকে মুক্ত করা।
পতনের বিকট শব্দ শুনে প্রেমিক দ্রুত নিচে নেমে আসেন এবং শিয়াওইকে রক্তাক্ত ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে কাছের হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রাথমিক চিকিৎসার খরচ হিসেবে সেখানে ২০ হাজার ইউয়ান জমাও দেন তিনি। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানান, ১৮ তলা থেকে আছড়ে পড়ার কারণে শিয়াওইয়ের শরীরের ওপর ভয়াবহ শারীরিক আঘাত এসেছে। তার মাথা, ফুসফুস, যকৃৎ ও প্লীহায় গুরুতর জখম হয়েছে। সেই সঙ্গে পেলভিস ও পিউবিক হাড়সহ দুই পায়ের একাধিক স্থান খণ্ডবিখণ্ড হয়ে ভেঙে গেছে। চিকিৎসকরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ইতিমধ্যে দুটি জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছেন। তবে তার শরীরে আরও কয়েকটি জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, যা খরচের অভাবে আপাতত থমকে আছে।
হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর শিয়াওই তার পরিবারের কাছে সেই রাতের লোমহর্ষক পরিস্থিতির বর্ণনা দেন। তার চাচা লি জানান, এর আগেও বেশ কয়েকবার ওই তরুণের হাতে শিয়াওই নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। সারা রাত বন্দী অবস্থায় মানসিক নির্যাতনে শিয়াওইয়ের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পেয়েছিল। তবে এত বড় দুর্ঘটনার পর অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গিয়ে শিয়াওই এখন নিজের ওই চরম সিদ্ধান্ত ও তাৎক্ষণিক ভুলের জন্য অনুশোচনা করছেন।
বর্তমানে শিয়াওইয়ের পরিবারের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চিকিৎসার বিশাল ব্যয়ভার। পরিবারটির আর্থিক অবস্থা এমনিতেই বেশ নাজুক। ২০২২ সালে শিয়াওইয়ের মায়ের শরীরে ম্যালিগন্যান্ট ক্যানসার শনাক্ত হয়। তার দীর্ঘ চিকিৎসায় পরিবারের সমস্ত জমানো অর্থ শেষ হয়ে যায় এবং তারা বড় অঙ্কের দেনায় জড়িয়ে পড়েন। শিয়াওইয়ের চিকিৎসায় ইতিমধ্যে এক লাখ ইউয়ানের বেশি খরচ হয়ে গেছে, যার মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার ইউয়ান এখনো হাসপাতালের পাওনা রয়েছে। অসহায় পরিবারটি অনলাইনে ক্রাউডফান্ডিং বা তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে প্রায় ৯০ হাজার ইউয়ান তুলতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিশাল বাজেট কীভাবে জোগাড় হবে, তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।
দুর্ঘটনার পর থেকে পরিবারের সদস্যরা শিয়াওইয়ের প্রেমিককে হাসপাতালে ঢোকার কোনো অনুমতি দিচ্ছেন না। তাদের স্পষ্ট কথা, ওই তরুণের উপস্থিতি শিয়াওইয়ের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর আরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এত নিষেধ সত্ত্বেও ওই তরুণ বেশ কয়েকবার হাসপাতালে ঢোকার চেষ্টা চালান। পরিস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠলে পুলিশ ডেকে তাকে হাসপাতাল এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ভাগ্যের অসীম কৃপার কথা স্মরণ করে শিয়াওইয়ের চাচা লি বলেন, “আমার ভাতিজি সত্যিই এক অলৌকিক ভাগ্য নিয়ে জন্মেছে। যে ঝোপের ওপর সে আছড়ে পড়েছিল, তার মাত্র কয়েক ফুট দূরেই ছিল শক্ত পাকা মেঝের উঠান। আঘাতটা সেখানে লাগলে তাকে কোনোভাবেই আর বাঁচানো যেত না।”
মন্তব্য