খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুলাই ২০২৬, ৮:০ পিএম

ভারী বর্ষণ এবং ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্র প্রভাবে শেরপুরের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে উঠে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দুর্যোগের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে নালিতাবাড়ী উপজেলার বাঘবেড় ইউনিয়নের নয়াপাড়া দক্ষিণ সন্ন্যাসীভিটা এলাকায়। সেখানে চেল্লাখালী নদীর ওপর নির্মিত একটি লোহার বেইলি সেতু প্রবল স্রোতের তোড়ে ভেঙে পড়লে সেতুর ওপর থাকা চারজন মানুষ পানিতে ভেসে যান। পরে পুলিশ জানায়, তাদের সবাইকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (২০ জুলাই) সকাল থেকেই চেল্লাখালী নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে নদীর পানি বিপৎসীমার ৩২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। একই সময়ে ভোগাই ও মহারশী নদীর পানিও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। আকস্মিক এই পরিস্থিতিতে নালিতাবাড়ী উপজেলার কলসপাড় ও যোগানীয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের অন্তত দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রবল স্রোত বেইলি সেতুর ওপর দিয়েই বয়ে যাচ্ছে। সেই অবস্থায় দুই কিশোরসহ চারজন সেতু পার হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। হঠাৎ সেতুটি কাত হয়ে ভেঙে পড়লে তারা স্রোতে পড়ে যান। প্রাণ বাঁচাতে কেউ কেউ সেতুর রেলিং আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তীব্র স্রোতের কাছে টিকতে পারেননি। ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানুষের আতঙ্কিত চিৎকারে চারপাশ ভারী হয়ে ওঠে। অনেককে উচ্চস্বরে বলতে শোনা যায়, “ওহ আল্লাহ, রক্ষা করো।”
নালিতাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিকুর জামান জানান, সেতু ভেঙে স্রোতে ভেসে যাওয়া দুই শিশুসহ চারজনকেই উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের উদ্ধারের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ভোগাই, চেল্লাখালী, মহারশী, কালঘোষা, সোমেশ্বরী ও কর্ণঝোড়া নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে।
চেল্লাখালী নদীর পানি বেড়ে শেরপুর–গাজীরখামার–নালিতাবাড়ী সড়কের বালুঘাটা গোল্লারপাড় এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই যানবাহন চলাচল করছে। অন্যদিকে ঝিনাইগাতী সদর বাজারে পানি ঢুকে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলার নিচু এলাকার অন্তত ৮ থেকে ১০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে শতাধিক মাছের ঘের ভেসে গেছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষেত এবং সদ্য রোপণ করা আমনের বীজতলা। এতে কৃষক ও মৎস্যচাষিদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন তৎপর রয়েছে। ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল আমীন নৌকাযোগে দুর্গত এলাকায় গিয়ে পানিবন্দী পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন। একই সঙ্গে শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে জানান, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য চাল, শুকনো খাবারসহ জরুরি ত্রাণসামগ্রী সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
মন্তব্য