বগুড়ার শেরপুরে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, কর্মচারীদের মারধর এবং পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে পৌর যুবদলের এক নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলায় শেরপুর পৌর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম সম্রাটকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া যুবদলের আরও ১২ জন নেতাকর্মীর নাম এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় ৫০ থেকে ৬০ জনকেও মামলায় আসামি করা হয়েছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) শেরপুর থানায় মামলাটি করেন সায়েম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস ও সায়েম ট্রেডার্সের পরিচালক এবং শেরপুর উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আবদুল্লাহ আল রাফাত (৩৩)। তিনি প্রতিষ্ঠান দুটির স্বত্বাধিকারী প্রবাসী আবদুল মান্নানের ছেলে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, শেরপুর পৌরসভার সান্যালপাড়া হাটখোলা সড়ক এলাকায় সায়েম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস ও সায়েম ট্রেডার্স নামে দুটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়ে আসছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তরিকুল ইসলাম সম্রাট ওই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই সময় প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মো. রেজাউল করিম মণ্ডল সুরুজের কাছে মালিকের মাধ্যমে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ওই এলাকায় ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না এবং প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন জায়গা দখল করে নেওয়া হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয় বলে মামলার বাদী দাবি করেছেন।
এর দুই দিন পর, ১০ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তরিকুল ইসলাম সম্রাটের নেতৃত্ব ও মদদে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই দলের কয়েকজনের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানে ঢুকেই তারা আবার পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। এ সময় আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
হামলার সময় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা বাধা দিলে তাঁদের মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে কার্যালয়ের টেবিলের ওপর রাখা একটি ব্যাগ থেকে নগদ এক লাখ ১০ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। পরে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হয়েছে বলেও মামলার বাদী দাবি করেছেন। ওই ফুটেজ তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
বাদীর বক্তব্য
মামলার বাদী আবদুল্লাহ আল রাফাত বলেন, অভিযুক্তদের সঙ্গে তাঁরা একই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। এরপরও তাঁদের পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর এবং পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবির ঘটনায় তাঁরা আতঙ্কিত। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
রাফাত আরও অভিযোগ করেন, এর আগেও সরকারি অধিগ্রহণ করা জমি দখল করে তরিকুল ইসলাম সম্রাট ভাড়া-বাণিজ্য চালিয়ে আসছিলেন। তাঁর দাবি, এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় এনে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অভিযোগ অস্বীকার যুবদল নেতার
তবে মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তরিকুল ইসলাম সম্রাট। তিনি বলেন, ঘটনার সময় তিনি শেরপুর শহরের গোসাইবাড়ী বটতলা এলাকায় ছিলেন। তাঁর দাবি, সেখানে চাঁদা দাবি, হামলা বা ভাঙচুরের কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
তরিকুল ইসলাম বলেন, মূলত জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি ঘটেছে। তাঁর ভাষ্য, বাদীপক্ষ স্থানীয় পৈতৃক ও সরকারি জমি দখলের চেষ্টা করছে। এর প্রতিবাদে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সেখানে গিয়েছিলেন। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করা এবং হয়রানি করার উদ্দেশ্যেই থানায় মিথ্যা মামলা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করলেই প্রকৃত পরিস্থিতি পরিষ্কার হবে। তাঁর দাবি, সেখানে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবির কোনো ঘটনা ঘটেনি।
তদন্ত করছে পুলিশ
শেরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এস এম মঈনুদ্দিন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এ ঘটনায় থানায় মামলা নেওয়া হয়েছে এবং মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।
তিনি জানান, এজাহারে চাঁদা দাবি, হামলা ও ভাঙচুরসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
একদিকে মামলার বাদীপক্ষ পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবি, হামলা, ভাঙচুর, মারধর ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছে। অন্যদিকে প্রধান আসামি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটিকে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের ফল বলে দাবি করেছেন। ফলে মামলার তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।









